অভিষেক ঘোষ, মালবাজার: সকাল থেকে রাত— সুভাষ মোড়ে মালবাজার থানার উলটোদিকে ফুটপাথের ওপর থাকা একটি চায়ের দোকান সবসময় গমগম করে (Malbazar)। বিমল বর্মনের চায়ের দোকান চেনেন না, এমন মানুষ শহরে দুর্লভ। খোলা আকাশের নীচে ওই অস্থায়ী চায়ের দোকানে সুখ, দুঃখের বহু কাহিনীর আদানপ্রদান হয় মানুষে মানুষে। দোকানটি যেন অস্থায়ী ক্লাবঘর। রাজনীতি থেকে শুরু করে খেলা— আড্ডার বিষয়বস্তুর সীমারেখা নেই। তাই তো প্রতিদিন একবার হলেও বিমলের দোকানে আসা চাই-ই চাই শহরবাসীর একাংশের। তবে বিমল একা নন, দোকান চালান আসলে দুই ভাই। বিমল আর পরিমল। এই চারহাতের কোনও বিশ্রাম নেই। চা, বিস্কুট ছাড়াও ঘুগনি, চাউমিন, পুরি, ডিমটোস্ট পাওয়া যায়। একের পর এক অর্ডার আসে। দুই ভাই হাসিমুখে কাজ করে চলেন।
দোকানের পোশাকি নাম, বিমল টি শপ। আজ থেকে প্রায় ২৯ বছর আগে মাল পুরসভার মিলনপল্লির বাসিন্দা বিমল চায়ের দোকানটি শুরু করেন। ২২ বছর আগে দোকানটি স্থানান্তরিত হয় থানার বিপরীতে। আগে দোকানটি ছিল এখনের থেকে ৫০০ মিটার দূরে। বিমলের চায়ের দোকান এখনও কাঠের। প্রতিদিন সকাল ৮টায় দুই ভাই দোকান খোলেন। বন্ধ করতে করতে রাত ১১টা বাজে। শহরের বাইরেও বিমল, পরিমলের সুনাম ছড়িয়েছে। তারপরেও দুই ভাই সাদামাটা জীবনযাপন করতেই ভালোবাসেন।
বিমলের চায়ের স্বাদে মোহিত হয়েছেন নেতা, অভিনেতা প্রত্যেকেই। প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতা অরূপ চক্রবর্তী ওই দোকানে এসেছেন। সময় কাটিয়েছেন নির্ভেজাল আড্ডায়। বলিউড-টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা রাজেশ শর্মাও একবার এসেছিলেন। সেসব স্মৃতি এখনও অমলিন দুই ভাইয়ের কাছে। কাজের ফাঁকে পরিমল অকপটে বললেন, ‘অভিনেতা রাজেশ শর্মা আমাদের দোকানের চা খেয়ে সুনাম করেছিলেন। মহম্মদ সেলিম, অরূপ চক্রবর্তীও দোকানের পরিবেশের প্রশংসা করেছেন।’
জলপাইগুড়ি জেলার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও ওই দোকানে সন্ধের পর ঢুঁ মারেন। ওই দোকানে গেলে দেখা মেলে তৃণমূলের টাউন সভাপতি পুলীন গোলদার, বিজেপির নবীন সাহা, রাকেশ নন্দী বা সিপিএমের রাজা দত্তের। মতাদর্শ আলাদা হলেও চায়ের রুচি যে প্রত্যেকের এক। রাজা বলেন, ‘সুযোগ পেলে দিনে একবার হলেও যাই। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়।’ নবীনের স্বীকারোক্তি, ‘বিমলের চা মানসিক চাপ কমায়। ভালো আড্ডা জমে। কখনও বিরক্ত বোধ করিনি।’
ওই দোকান আবার একজনের কাছে কাজের জায়গা। তিনি সুশান্ত দাস। পাশেই থানা। সুশান্ত অভিযোগপত্র লেখার কাজ করেন। ‘ক্লায়েন্ট’দের ডেকে নেন বিমলের চায়ের দোকানে। সুশান্তের কথায়, ‘এটা আমার অস্থায়ী আস্তানা। কেউ অভিযোগপত্র লেখাতে চাইলেই এই দোকানে ডেকে নিই।’ বিমল জানালেন, অধিকাংশ মানুষ তাঁদের দোকানের লাল চা পছন্দ করেন। তাই ভালো মানের চা পাতা ব্যবহার করতে হয়। কারও কাছে চা আভিজাত্যের, আবার কারও কাছে চা নিছকই পানীয়— তাঁদের মিলনক্ষেত্র বিমল টি শপ।

