জিতেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে বিজেপি। সেই চ্যালেঞ্জ গেরুয়া শিবির গ্রহণ করবে কি না, সেটা বড় প্রশ্ন। ভোট মিটতে না মিটতে হিংসার উদ্ভব সেই চ্যালেঞ্জের কারণ। গণনার ২৪ ঘণ্টা আগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বদলা নয় বলে দলকে বার্তা দিয়েছিলেন বটে। কিন্তু ইতিমধ্যে বিভিন্ন অশান্তিতে বিজেপিকে জড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছে। উত্তরবঙ্গের দিনহাটায় তৃণমূলের সঙ্গে সংঘর্ষে অগ্রণী হয়েছেন বিজেপি কর্মীরা।
জলপাইগুড়িতে গণনাকেন্দ্রের সামনেও দুই দলের মধ্যে বিবাদ বেধেছিল। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক বাপি গোস্বামী সামাল দিয়ে নিজেই তৃণমূল শিবিরে বসে পড়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু তাতে জেলার আর কোথাও তাঁর দল অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়াবে না- এমন নিশ্চয়তা নেই। দক্ষিণবঙ্গের আসানসোল, ব্যারাকপুর, ক্যানিং ইত্যাদি এলাকাতেও অশান্তি ঘটেছে একের পর এক। কেন্দ্রীয় বাহিনী তৎপর থাকায় কোথাও গোলমাল বড় আকার নিতে পারেনি বটে। কিন্তু অশান্তি বাড়বে না- এমন কথা হলফ করে বলা যায় না।
শমীকের বার্তা শুনে রাজ্যের সর্বত্র বিজেপি নেতা-কর্মীরা সাধু হয়ে নাও থাকতে পারেন। কেন না, তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্ররোচনা থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট। তাছাড়া ভোটের প্রচার চলাকালীন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণে প্ররোচনা যথেষ্ট ছিল। তিনি বলেছিলেন, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উদার নন। ৪ মে’র পর তিনি দেখে নেবেন কোন জল্লাদের ঘাড়ে ক’টা মাথা, কাকে দিল্লির কোন বাপ বাঁচায়।
এমনকি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র উদ্দেশে তিনি ৪ মে দুপুরে বাংলায় থেকে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন। মমতা পর্যন্ত গণতান্ত্রিক বদলা নেবেন বলে আস্ফালন করেছিলেন। যদিও খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণে হিংসার উপাদান ছিল। তিনি ভোটের পর উলটো করে ঝুলিয়ে মারার যে মন্তব্য করেছিলেন, তা অধিকাংশ বিজেপি নেতা-কর্মীর মুখের লবজ হয়ে গিয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে শমীক যতই বলুন, শান্তি রক্ষা বিজেপির পক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসের আগাম সম্ভাবনায় আধাসেনাকে আরও কিছুদিন বাংলায় রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। গণনা শেষে বিভিন্ন এলাকায় গণ্ডগোল শুরু হওয়ায় কমিশনের তরফে রাজনৈতিক দলগুলিকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যেন হুমকি পেলে তাদের জানানো হয়। যদিও বাংলার রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত সবাই জানেন, এই আশ্বাস থাকলেও গোলযোগ পুরোপুরি এড়ানোর সম্ভাবনা কঠিন। আধাসেনা থাকলেও ২০২১-এ হিংসায় বিধ্বস্ত হয়েছিল বাংলা।
এই বিপুল জয়ের পর বিজেপির দায়িত্ব কিন্তু এখন অপরিসীম। সব ঠিক থাকলে শীঘ্রই রাজ্যের শাসক হিসেবে শপথ নেবে বিজেপি। তারপর রাজ্য সরকার চলবে বিজেপির কথায়। রাজ্য সরকারের দায়িত্ব যেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, তাই শাসকদল হিসেবে বিজেপির কর্তব্য নিঃসন্দেহে বিরাট। সেই কর্তব্য ঠিকঠাক যদি বিজেপি পালন করতে না পারে, তাহলে ২০২১-এ তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছিল, তাতে তারাও বিদ্ধ হবে।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শপথগ্রহণের পরই প্রশ্নের মুখে বিজেপি সরকার। শান্তি মানুষের আকাঙ্ক্ষিত। মানুষের এই রায়ের অন্যতম হল শান্তিতে জীবনযাপন, জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা। তা বিঘ্নিত হলে অবিচার হবে মানুষের রায়ের ওপর। তাছাড়া পরিস্থিতি অশান্ত থাকলে তার প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। ব্যবসা মার খায়। জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি হয়। তেমন পরিস্থিতি তৈরির অর্থ মন্ত্রীসভা তৈরির পরই বিপদ ডেকে আনা।
ফলে সামনে এখন বিজেপির কঠিন চ্যালেঞ্জ। শুভেন্দু অধিকারী অতি সত্য কথা বলেছেন যে, তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থাকেন বলে তাঁদের চিন্তার কিছু থাকে না। বিপদে পড়েন শুধু সাধারণ মানুষ। অর্থাৎ রাজায় রাজায় যুদ্ধে প্রাণ যায় উলুখাগড়ার। এই বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে ও শান্তি রক্ষার স্বার্থে বিজেপির দায়িত্ব এখন অনেক।



