Blue Ink Distress | নীল কালির বিষাক্ত চুম্বনে বড়ই বিড়ম্বনা, ভোটকর্মীদের আঙুলে এবার ‘অদৃশ্য’ দংশন!

শেষ আপডেট:

গণতন্ত্রের যজ্ঞের শেষে যজ্ঞশালার হোতাদের হাতের আঙুলগুলি যে নীল বর্ণ ধারণ করবে, তা নির্বাচনি বিধানে লেখা ছিল না। কিন্তু দোয়াতে থাকা সিলভার নাইট্রেট এমন এক নীল কামড় বসিয়েছে যে, সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দুও বুঝি তাঁর ওথেলো-মার্কা মেকআপ দেখে লজ্জা পেতেন। 

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

ফেসবুকে ‘নীল বিপ্লব’ শুরু হয়েছে। মার্ক জুকেরবার্গের তৈরি ক্যানভাসে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে আর্তনাদ আর চোখ মেললে দেখা যাচ্ছে বিচিত্র সব ফোলা আঙুলের প্রদর্শনী। মনে হচ্ছে, কোনও দুষ্টু জাদুকর এসে ভোটকর্মীদের আঙুলগুলোকে রাতারাতি আলফ্রেড হিচককের ভূতুড়ে সিনেমার প্রপ বানিয়ে দিয়েছে। কারও আঙুলের ডগা ফুলে গোল হয়েছে, কারও গোটা আঙুলটাই। ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়ার আক্ষরিক রূপান্তর বোধহয় একেই বলে। তবে সেই কলাগাছটি এখানে সবুজ নয়, নীল (Blue Ink Distress)। যেন কোনও বিচিত্র এলিয়েন এসে গোপনে হ্যান্ডশেক করে গিয়েছে অভাগা পোলিং অফিসারদের সঙ্গে।

ভোটকর্মীদের (Election Workers) ব্রহ্মাস্ত্র হল একটি ছোট্ট শিশি, যার ভেতরে বন্দি থাকে গণতন্ত্রের পবিত্র নির্যাস, অমোচনীয় নীল কালি। ভোটারের আঙুলে এই কালির একটি ছোট্ট আঁচড়ই প্রমাণ করে দেয় যে, তিনি তাঁর নাগরিক দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছেন। কিন্তু কে জানত, এই নিরীহ নীল কালিই একদিন বুমেরাং হয়ে খোদ ভোটকর্মীদের দিকেই ধেয়ে আসবে! ভোটারদের আঙুলে গণতন্ত্রের টিকা লাগাতে গিয়ে ভোটকর্মীদের আঙুলে, হাতের বিভিন্ন অংশে সেই কালি লেপ্টে গিয়েছে৷ তারপরই দেখা দিয়েছে বিপত্তি। সম্প্রতি এই কালি-বিভ্রাট নিয়ে ভোটকর্মীদের মধ্যে যে তুমুল আলোড়ন শুরু হয়েছে, তা একদিকে যেমন মর্মান্তিক, অন্যদিকে তেমনই নিখাদ হাস্যরসের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার।

গণতন্ত্রের যজ্ঞের শেষে যজ্ঞশালার হোতাদের হাতের আঙুলগুলি যে নীল বর্ণ ধারণ করবে, তা নির্বাচনি বিধানে লেখা ছিল না। কিন্তু দোয়াতে থাকা সিলভার নাইট্রেট এমন এক নীল কামড় বসিয়েছে যে, সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দুও বুঝি তাঁর ওথেলো-মার্কা মেকআপ দেখে লজ্জা পেতেন। যে কালি দিয়ে বাঙালির আঙুলে তিলক আঁকার কথা, সেই কালিই আজ ভোটকর্মীদের হাতে ‘নীল দর্পণ’ নাটকের নতুন পাণ্ডুলিপি রচনা করে ফেলেছে।

ভোটকেন্দ্রে যিনি ভোটারের আঙুলে কালি লাগানোর দায়িত্বে থাকেন, তাঁর কাজটি দেখতে খুব সহজ মনে হলেও আদতে তা নয়। সকাল থেকে সন্ধে অবধি শয়ে-শয়ে মানুষের বাঁ হাতের তর্জনী খুঁজে বের করে তাতে তুলির নিখুঁত টান দেওয়া একপ্রকার শিল্প। কিন্তু এই প্রবল ব্যস্ততা আর হুড়োহুড়ির মধ্যে একটু-আধটু কালি যে ভোটকর্মীর নিজের হাতে লাগবে না, এমন গ্যারান্টি কে দেবে? সাধারণত এই সামান্য কালির দাগকে ভোটকর্মীরা বীরত্বের তিলক হিসেবেই মেনে নেন। যেন রণাঙ্গন থেকে ফিরে আসা সৈনিকের গায়ের ধুলো। কিন্তু এবারের চিত্রপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। এইবারের কালি যেন তার স্বভাবসিদ্ধ গাম্ভীর্য হারিয়ে এক অদ্ভুত আক্রোশে ফেটে পড়ল ভোটকর্মীদের আঙুলের ওপর।

ইভিএম (EVM) সিল করে, রাতে যখন কর্মীরা বাড়ি ফিরলেন, তখনও তাঁরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কী সাংঘাতিক বিপর্যয় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল আসল খেলা। যাঁদের হাতে বা আঙুলে ওই নীল কালি লেগেছিল, প্রথমে সেখানে শুরু হল হালকা চুলকানি। এরপর তা রূপ নিল তীব্র জ্বালাপোড়ায়। সকাল হতে না হতেই দেখা গেল, অনেকের আঙুল ফুলে একেবারে ঢোল! ত্বক লাল হয়ে উঠেছে, কারও কারও তো রীতিমতো ফোসকা পড়ে ঘা হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সিলভার নাইট্রেট মিশ্রিত কালি যে ত্বকের সংস্পর্শে এসে এমন ভয়ংকর রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে পারে, তা হয়তো নির্বাচন কমিশনের কর্তারাও স্বপ্নে ভাবেননি। অমোচনীয় কালি যে কেবল মুছতে চায় না তা নয়, এবার সে যেন চামড়া সুদ্ধ তুলে নেওয়ার পণ করেছে।

আতঙ্কিত ভোটকর্মীদের কেউ কেউ ইতিমধ্যেই চিকিৎসকদের চেম্বারে হাজির হয়েছেন। গণতন্ত্রের সেবকদের এমন করুণদশা দেখে চিকিৎসকরাও প্রাথমিকভাবে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছেন। রাসায়নিক দহনের এই অভিনব রূপ আগে খুব একটা দেখা যায়নি। অগত্যা অ্যান্টিঅ্যালার্জিক ওষুধ, স্টেরয়েড ক্রিম আর ব্যথানাশকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে তাঁদের। কিন্তু কালির জেদ যেন অবাধ্য প্রেমিকের চেয়েও বেশি। সে সহজে আঙুল ছাড়তে চাইছে না। সে যেন বলতে চাইছে, ‘আমি তোমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকব’।

বাঙালি তার যে কোনও ব্যথাবেদনা বা ক্ষোভ প্রকাশের জন্য বর্তমানে যে জায়গাটিকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে, তা হল ফেসবুক। সুতরাং, কালি-বিপর্যয়ের এই করুণ কাহিনী যে সোশ্যাল মিডিয়ায় আছড়ে পড়বে, সেটাই ছিল স্বাভাবিক। ভোটকর্মীরা ফেসবুকে নিজেদের দুঃখের কথা জানাতে শুরু করলেন। কে কতটা যন্ত্রণায় ভুগছেন, কার আঙুল কতটা ফুলেছে— তাই নিয়ে শুরু হল বিস্তর আলোচনা। এই চরম ডামাডোলের মধ্যে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন একাধিক সহৃদয় চিকিৎসক। ডাঃ সৌমিত্র মণ্ডল সুদীর্ঘ পোস্ট করে কালি-বিভ্রাটের বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করেছেন, কিছু জরুরি পরামর্শও দিয়েছেন।

চিকিৎসকের সেই পোস্টের কমেন্ট বক্সটি আপাতত একটি ভার্চুয়াল হাসপাতাল। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আহত ভোটকর্মীরা সেখানে ভিড় জমিয়েছেন। তাঁরা কথায় নয়, প্রমাণে বিশ্বাসী। তাই নিজেদের আহত, ক্ষতবিক্ষত ও ফুলে যাওয়া আঙুলের ছবি দিয়ে কমেন্ট বক্স ভরিয়ে দিয়েছেন। একজন লিখেছেন, ‘স্যর, দু’দিন ধরে ঘুমাতে পারছি না, যন্ত্রণায় হাত ছিঁড়ে যাচ্ছে।’ আরেকজন মন্তব্য, ‘গণতন্ত্র রক্ষা করতে গিয়ে নিজের আঙুলটাই যে বিসর্জন দিতে হবে, তা তো আগে বুঝিনি!’ এসব মন্তব্য আর ছবির ভিড়ে এক অদ্ভুত ভ্রাতৃত্ববোধের সৃষ্টি হয়েছে। সবাই যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়েছেন, যাঁদের পরিচয় একটাই, তাঁরা সকলেই নীল কালির এই বিষাক্ত চুম্বনের শিকার। সব মিলিয়ে এই কালি-বিভ্রাট রাজ্যের নির্বাচন প্রক্রিয়ার ইতিহাসে এক নতুন এবং অভিনব অধ্যায় সংযোজন করেছে।

কালি নিয়ে রসিকতা অনেক হচ্ছে, তবে সেই জ্বলুনি আর ফোসকার নীচে যে কতটা নাগরিক যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে, তা একমাত্র সেই নীল আঙুলের মালিকরাই অনুভব করছেন। বালুরঘাটের একটি স্কুলের করণিক অমিত সাহার কথাতেই তা স্পষ্ট, ‘দু’দিন থেকে ঠিকমতো খেতে পারছি না। পরিবারের কোনও সদস্য চামচ দিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেন।’ কোচবিহারের ভোটকর্মী সুবল বিশ্বাস আবার চিকিৎসার খরচ দাবি করেছেন। তাঁর যুক্তি, ‘নির্বাচনের কাজে গিয়েই ডাক্তারের ফি, ওষুধ মিলিয়ে এখনও ১২০০ টাকা খরচ করেছি। এই টাকা নির্বাচন কমিশনেরই দেওয়া উচিত।’

ভোটের ফল বেরোতে সময় লাগে, কিন্তু কালির ফল যে এমন হাতেনাতে মিলবে, তা ছিল ধারণার অতীত। কালির মহিমা সত্যিই অপার। এখন অনেকেই মনে মনে সত্যজিৎ রায়ের গুপী গাইন বাঘা বাইনের সেই জাদুকর বরফিকে স্মরণ করছেন। সে এলে হয়তো এক চুটকিতে এই নীল বিষটুকু নামিয়ে দিতে পারত।

Sushmita Ghosh
Sushmita Ghoshhttps://uttarbangasambad.com/
Sushmita Ghosh is working as Sub Editor Since 2018. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Digital. She is involved in Copy Editing, Uploading in website and various social media platforms.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

Swapna Barman | ‘বাড়ি জ্বালিয়ে দিল’! স্বপ্না বর্মনের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শোরগোল

উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি...

Witchcraft Allegation | রায়গঞ্জে ডাইনি অপবাদের নারকীয় অন্ধকার, দম্পতিকে মলমূত্র খাওয়ানোর অভিযোগ!

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: একবিংশ শতাব্দীতেও কুসংস্কারের চরম অন্ধকার রায়গঞ্জে।...

Cooch Behar | শুভেন্দুর কনভয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় ‘অ্যাকশন’! কোচবিহারে গ্রেপ্তার ব্লক সভাপতি সহ ৩ তৃণমূল নেতা

শিবশংকর সূত্রধর,কোচবিহার: গত বছর খাগড়াবাড়িতে শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari)...

Cooch Behar | এমজেএন মেডিকেলে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে কাঠগড়ায় হাসপাতাল! গঠন হল তদন্ত কমিটি

কোচবিহার: এমজেএন (MJN) মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (Cooch Behar)...