পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: ধূপধুনোর গন্ধে আর বাজনার তালে মেতে উঠেছে বালুরঘাটের (Balurghat) বোল্লা গ্রাম। কালীপুজো মানে এখানে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধনও বটে। পুজোর চারদিন গোটা গ্রাম পরিণত হয় হিন্দু-মুসলিম মিলনের এক উৎসবমুখর মেলায়।
বোল্লাকালীপুজো (Bolla Kalipuja) ও তাকে ঘিরে মেলা মহামিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে পুজোর ক’দিন। বোল্লা গ্রামে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস বেশি। আনন্দ উপভোগ করতে সেইসব পরিবারের মানুষ এবং আত্মীয়স্বজন আসেন। এমনকি, মুসলিম বাড়িতে হিন্দু বন্ধুবান্ধবদের ভিড় পড়ে মেলার কয়েকদিন। পুজোর আগে বাড়িঘর রং ও মেরামত করে সাজিয়ে তুলেছেন মুসলিম পরিবারগুলো। মন্দিরে পুজো দিয়ে প্রসাদ নিয়ে সেই মুসলিম বাড়িতেই হাজির হচ্ছেন হিন্দু ভক্তরা। ঘাড়ে হাত রেখে পাঁপড়ভাজা থেকে পেয়ারা মাখা খেতে ব্যস্ত ‘এক বৃন্তে দুটি কুসুম’। চায়ের দোকানেও চলছে জমজমাট আড্ডা।
গ্রামের বাসিন্দা রাহুল সরকার হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমাদের কাছে কালীপুজো মানে শুধু পুজো নয়। বন্ধুত্বের উৎসব। ছোটবেলা থেকে হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে আমরা উৎসবে মেতেছি। মেলায় দোকানে দোকানে গিয়ে খাবার খাই। সেই বন্ধুত্বের ধারা এই প্রজন্মের মধ্যেও বজায় রয়েছে।’ স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম জানালেন, ‘আমার বাড়িতে পুজোর রাতে হিন্দু বন্ধুরা আসেন খেতে। আমরা সবাই মিলে পাঁপড় ভাজি। ধর্ম আলাদা হতে পারে। কিন্তু মন এক। এটাই বোল্লার ঐতিহ্য।’
হিলির তরুণ সুমন দাস বললেন, ‘প্রতিবছর বন্ধু জাহাঙ্গিরের বাড়িতে আসি। খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, হাসি- সব মিলিয়ে অন্যরকম আনন্দ হয়। মনে হয়, এটাই আসল পুজো।’
পতিরামের বাসিন্দা অরূপ মণ্ডলও বলেন, ‘বহু বছর ধরে স্থানীয় মুসলিম বন্ধুর বাড়িতে মেলা উপলক্ষ্যে আসি। কোনওদিন আলাদা মনে হয়নি। এই পুজো আমাদের একসঙ্গে থাকার শিক্ষা দেয়। এমন সম্প্রীতি আজকাল আর কোথায় দেখা যায়!’ বালুরঘাটের শিক্ষক গগন ঘোষ বলেন, ‘পুজো এলে ধর্মের ভেদরেখা মিলিয়ে যায় আনন্দের স্রোতে। পুজোর আগে মুসলিম পরিবারগুলো বাড়িঘর রং করে সাজিয়ে তোলে অতিথিদের জন্য। সেই বাড়িতে পুজোর দিনে হিন্দুরা হাজির হন প্রসাদ হাতে। আবার মেলা ঘুরে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ায় মেতে ওঠেন সকলে। এই দৃশ্য এখন বড় বিরল।’
ধর্মের দেওয়াল পেরিয়ে বোল্লা কালীপুজো আজও প্রমাণ দেয়, সম্প্রীতির মেলবন্ধন সত্যিকারের উৎসব। চায়ের দোকানে, মেলার মাঠে, কিংবা মন্দিরের সামনেও এক দৃশ্য। ধর্ম নয়, সবাই বন্ধুত্বের সুরে বাঁধা। রাতভর বাজনা, রোশনাই, মিষ্টিমুখ আর হাসির উচ্ছ্বাসে মুখর বোল্লা গ্রাম হয়ে ওঠে একতার প্রতীক।

