কোচবিহার: কোচবিহারের নতুন বাজার। বাজার মানেই আড্ডার জায়গা। এই বাজারকে কেন্দ্র করে তার আশপাশে দিনরাতে রাস্তার ওপর, দোকানের সামনে চলে দেদার আড্ডা। এমনকি বাজারের বিশেষ দু’একটি জায়গায় রাত বারোটার দিকে গেলেও আড্ডা দিতে দেখা যায় কয়েকজনকে। ঠিক এর পাশাপাশি সমানতালে চলছে আরও একটি আড্ডা। সেই আড্ডা চট করে চোখে দেখা যায় না। বেশ কিছু বছর হল শিব মন্দিরের ভেতরে বারান্দায় চলে গিয়েছে। মন্দিরের ভেতরে ঢুকলে তবেই দেখা যায় ওই আড্ডাবাজদের। এখানে যাঁরা আড্ডা দেন যৌবনকাল থেকে তাঁরা আজ বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছেন। তবুও ১০ মিনিটের জন্য হলেও ওই জায়গায় না গেলে দিনটা যেন সম্পূর্ণ হয় না তাঁদের।
ঘড়িতে তখন বারোটা বাজতে দশ। কল্যাণ সংঘের বাড়ি থেকে টোটো নিয়ে নতুন বাজারের পেছনদিকে আড্ডার জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন প্রণব দত্ত। ঠিক বারোটায় আড্ডাটা শুরু হলেও প্রতিদিন একটু আগেই চলে আসেন তিনি। এখানে না এলে ঠিক অক্সিজেন পাওয়া যায় না। এই আড্ডার জায়গার বেশিরভাগ দিনই তিনি প্রথম উপস্থিত হন। জায়গাটা নতুন বাজারের উত্তর দিকে কালী মন্দির। মূলত এটি শিব মন্দির হলেও বর্তমানে কালী মন্দির হিসাবেই বেশি পরিচিত। মন্দিরের ভেতরে ঢুকে ভাঁজ করা চেয়ারের থেকে একটা তুলে নিয়ে বসে একবার উলটে হাতঘড়িটা দেখে নিলেন। চোখটা বারবার মন্দিরের গেটের দিকে চলে যাচ্ছে। বারোটা বাজতে বাজতেই গুটিগুটি পায়ে সেখানে হাজির সত্যপ্রসাদ দাস। সাইকেল নিয়ে চলে আসলেন পার্থ ব্রহ্ম, রঞ্জিতকুমার বোস। ভেতরে ঢুকেই যে যার মতো একটা করে চেয়ার তুলে বসে পড়লেন। এক-দুই করে মোটামুটি সদস্য সংখ্যা যখন সাত-আট পেরোল তখনই হাঁক পড়ল চায়ের। উলটো দিকের চায়ের দোকানটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পাশের বৌদির দোকান থেকেই চা আসে। এরমধ্যেই এই আড্ডার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য বিভূতিভূষণ নন্দী ঢুকতেই হইহই করে উঠলেন সকলে। ভারত টি২০ বিশ্বকাপ জেতার খুশিতে সবার জন্য আঙুর নিয়ে এসেছেন তিনি।
নতুন বাজারের পেছনে ওই মন্দিরের ভেতরে ঢুকলেই বারোটা থেকে দুটো পর্যন্ত দেখা মিলবে জনাদশেক ষাটোর্ধ্ব মানুষকে। প্রত্যেকেই প্রাক্তন রাজ্য অথবা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী। বাচ্চু গোপ্পী, পার্থ ব্রহ্ম, ব্রজনন্দন পাল, প্রণব দত্ত, তপন সিনহা, রঞ্জিতকুমার বোস, শেখর চক্রবর্তী, নির্মলেন্দু চক্রবর্তী, সত্যপ্রসাদ দাস, প্রাণকৃষ্ণ ঘোষ সকলেই চাকরিজীবন শেষ করে এখন ঝাড়া হাত-পা। এই আড্ডার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য বিভূতিভূষণ নন্দী। তিন বছর হল অবসর নিয়েছেন তিনি কিন্তু তারও ১১ বছর আগের থেকে এই আড্ডায় তিনি যুক্ত। প্রায় ৪০ বছর হল আমাদের এই আড্ডা চলছে, বললেন নির্মলেন্দু চক্রবর্তী। এই আড্ডাটাই তাঁদের কাছে সারাদিনের অক্সিজেন। বর্তমানে ১১ সদস্যের এই দলটি কিছুদিন হল হারিয়েছে তাদের প্রিয় বন্ধু মমি, ভূদেব আর সমীরকে। মাসচারেক আগে চলে গিয়েছেন রণজিৎকুমার ঘোষ। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় বেশ কিছুদিন হল আসতে পারছেন না বাচ্চু গোপ্পী। তবে আড্ডার বন্ধুরা নিয়মিত খোঁজখবর নেন।
শীতকালে বার্ষিক ফ্যামিলি পিকনিক আর মাঝেমধ্যে এক-দুটো ছোট গাড়ি নিয়ে একটু জঙ্গলে বেরিয়ে পড়া এভাবেই সময় কেটে যায় তাঁদের, বললেন সত্যপ্রসাদ দাস। কিন্তু বাৎসরিক ফ্যামিলি পিকনিকটা হলেও বছরখানেক হল গাড়ি নিয়ে জঙ্গলে যাওয়া হচ্ছে না। নানান ধরনের শারীরিক সমস্যা ধীরে ধীরে জগৎটাকে ছোট করে আনছে। তবে বিপদে-আপদে সকলে একে অপরের হাত শক্ত করতে এগিয়ে আসেন। যৌবনের আড্ডার সঙ্গে বার্ধক্যের আড্ডার একটাই তফাত, সেখানেও আড্ডা থেকে লোক কমতে থাকে। যৌবনে হয়তো চাকরি সূত্রে বাইরে যাওয়া, আর বার্ধক্যে একেবারে সবকিছু ফেলে অন্য লোকে পাড়ি দেওয়া। তবুও ‘শো মাস্ট গো অন’-এর মতো আড্ডা চলতে থাকে…।
নিয়মিত ১১ জন ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন মাঝেমধ্যে চলে আসেন এই আড্ডায়। বসার সুবিধার জন্য নিজেরাই টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছেন কুড়িটা চেয়ার। আড্ডা বেশিক্ষণ গড়ালে, মাঝেমধ্যে হয়ে যায় দু’রাউন্ড চা। চায়ের কাপ হাতে ক্রিকেট থেকে রাজনীতি আলোচনার মোড় ঘুরে যায় নানান খাতে। তারপর গুটিগুটি পায়ে যে যার বাড়ির পথ ধরেন। আবার পরের দিনের অপেক্ষা…।

