মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

Cervical Cancer | সার্ভিক্যাল ক্যানসার: আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি

শেষ আপডেট:

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: সার্ভিক্যাল ক্যানসার বা জরায়ুমুখের ক্যানসার মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। এখনও অনেক মহিলাই এই রোগটি সম্পর্কে জানেন না, বা বলা ভালো তেমন সচেতন নন। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিংও করান না অনেকে। অথচ রোগটি সময়মতো ধরা পড়লে সুস্থতার সম্ভাবনা ৮০–৯০ শতাংশ বেড়ে যায়। রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বজুড়ে জানুয়ারি মাসটি সার্ভিক্যাল সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। এই রোগের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং সেরে ওঠার উপায় জানালেন শিলিগুড়ির রাঙ্গাপানির মণিপাল হসপিটালের রেডিয়েশন অঙ্কোলজি কনসালট্যান্ট ডাঃ সৌরভ গুহ

সার্ভিক্যাল ক্যানসার (Cervical Cancer) প্রধানত জরায়ুমুখের কোষে তৈরি হয় এবং এর প্রধান কারণ হিসেবে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)-র উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কিছু সংক্রমণকে দায়ী করা হয়। এই রোগটি ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় তেমন কোনও লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং ও সময়মতো রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ ধরা পড়লে, সঠিক সময়ে ও পর্যায়ভিত্তিক চিকিৎসা শুরু করলে সুস্থতার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

কীসের ওপর চিকিৎসা নির্ভর

সার্ভিক্যাল ক্যানসারের চিকিৎসা একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। ক্যানসারের পর্যায়, টিউমারের আকার, লিম্ফ নোডে ছড়িয়েছে কি না, রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না – এই সব বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। সাধারণত সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট, রেডিয়েশন অঙ্কোলজিস্ট ও মেডিকেল অঙ্কোলজিস্টদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ দল রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করে।

প্রাথমিক পর্যায়ে অস্ত্রোপচারের ভূমিকা 

যদি ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে এবং শুধুমাত্র জরায়ুমুখেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অস্ত্রোপচারই প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি হয়ে থাকে। খুব প্রাথমিক অবস্থায় কনাইজেশন বা লুপ ইলেকট্রোসার্জিক্যাল এক্সিশন প্রসিডিওর (এলইইপি) করে ক্যানসার আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা যায়। এইসব পদ্ধতি জরায়ু অক্ষত রেখে চিকিৎসার সুযোগ দেয়, যা ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের ইচ্ছে থাকা নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রোগ নির্মূলের জন্য হিস্টেরেক্টমি অর্থাৎ জরায়ু ও জরায়ুমুখ অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।

রেডিয়েশন থেরাপির গুরুত্ব

যখন ক্যানসার জরায়ুমুখের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে কিন্তু পেলভিক অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন রেডিয়েশন থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই চিকিৎসায় উচ্চ শক্তির রশ্মির মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়। এটি শরীরের বাইরে থেকে বা ব্র্যাকিথেরাপির মাধ্যমে শরীরের ভেতর থেকেও দেওয়া যেতে পারে। রেডিয়েশন থেরাপি স্থানীয়ভাবে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কেমোরেডিয়েশনঃ উন্নত পর্যায়ের চিকিৎসা

লোকালি অ্যাডভান্সড সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ক্ষেত্রে একসঙ্গে কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন দেওয়া হয়, যাকে কনকারেন্ট কেমোরেডিয়েশন বলা হয়। সাধারণত সিসপ্লাটিন-ভিত্তিক কেমোথেরাপি রেডিয়েশনের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমায়। বর্তমানে এটি উন্নত পর্যায়ের সার্ভিক্যাল ক্যানসারের স্বীকৃত মানক চিকিৎসা।

কেমোথেরাপি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি

যেসব ক্ষেত্রে ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে বা আগের চিকিৎসার পর আবার ফিরে এসেছে, সেখানে কেমোথেরাপি প্রধান চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি চালু হয়েছে, যা নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে বা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।

সন্তান ধারণের সক্ষমতা বজায় রাখার চিকিৎসা

অল্পবয়সি নারীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। নির্বাচিত কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষেত্রে র‍্যাডিকাল ট্রাকেলেক্টমি পদ্ধতিতে জরায়ুমুখ অপসারণ করে জরায়ু অক্ষত রাখা যায়, ফলে ভবিষ্যতে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে। তবে এই ধরনের চিকিৎসার আগে রোগীকে বিস্তারিতভাবে পরামর্শ দেওয়া এবং নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত জরুরি।

সহায়ক চিকিৎসা নিয়মিত ফলোআপের গুরুত্ব

ক্যানসারের চিকিৎসার পাশাপাশি সহায়ক চিকিৎসাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, মানসিক সহায়তা, পুষ্টি পরামর্শ এবং পুনর্বাসন রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার পথে বড় ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে রোগ ফিরে আসছে কি না তা নজরে রাখা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলির সমাধান করা সম্ভব হয়।

সার্ভিক্যাল ক্যানসার প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ৮০-৯০ শতাংশ নিরাময়যোগ্য রোগ। আধুনিক অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন ও ওষুধভিত্তিক চিকিৎসার অগ্রগতির ফলে আজ রোগীদের জীবনযাত্রার মান ও সুস্থতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিয়মিত স্ক্রিনিং, এইচপিভি টিকাকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসাই সার্ভিক্যাল ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

More like this
Related

Detox Diet | স্বাস্থ্যকর ডায়েটেই ত্বকের দফারফা? ভয়ের কারণ নেই, জানুন এর আসল রহস্য!

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: অনেকেই মনে করেন ভাজাভুজি ছেড়ে...

Hormonal Imbalance | হরমোনের হেরফেরে অনিয়মিত ঋতুস্রাব? সুস্থ থাকতে জীবনযাত্রায় আনুন এই বদলগুলি

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: অনিয়মিত ঋতুস্রাব, পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম...

Drinking Water | রাতে ঘুমানোর আগে জল খাচ্ছেন? অজান্তেই নিজের ক্ষতি করছেন না তো?

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: সুস্থ থাকতে পর্যাপ্ত জলপানের বিকল্প...

Waterless Fasting | উপোসেও থাক সজল টান, নির্জলা ব্রত শরীরের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ।...