গৌতম সরকার
দহন পথ হারিয়েছে। চৈত্র শেষেও সকাল-সন্ধ্যায় মৃদুমন্দ বাতাস। মাথার ওপর সূর্য উঠলেও কষ্টের অনুভূতি কম। ঝরা পাতা, শুকনো পাতা উধাও হয়ে গিয়েছে। রুক্ষ্ণতার লেশ মাত্র নেই কোথাও। বরং বসন্তের বর্ষণে মাঠঘাট, গাছপালা সবুজে ঢাকা। এমন চৈত্র শেষ কে কবে দেখেছে, কে জানে! এমন নির্বাচনেরই বা কে কবে সাক্ষী হয়েছে! প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের জীবনেও আশানিরাশার দোলাচল।


ভোটবাড়ির আলুচাষি অমূল্য বর্মন হাত ধরে নিয়ে গেলেন রাস্তার পাশের জমিতে। কিছু আলু লালবস্তায় বন্দি হয়ে মাঠে পড়ে। পাশে কিছু আলু ডাঁই করে রাখা। নষ্ট, পচা। চৈত্রের বৃষ্টি পথে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে অমূল্যের মতো অনেক কৃষককে। হাহাকার করে ওঠেন অমূল্যের স্ত্রী। গলায় কণ্ঠির মালা। ‘কী দোষ কইরলাম মুই হে কৃষ্ণ।’ তিনি জানালেন, ফলন ভালোই হয়েছিল। বৃষ্টির মার শেষ করে দিয়েছে মাঠের আলুকে। অমূল্য হিসেব করে বোঝালেন ক্ষতির পরিমাণ।
এক বিঘা জমির আলু এখন ট্রাক প্রতি ২৫ হাজার টাকার ওপর দাম বলেন না কেউ। তাতে ‘বীজের খরচটাও উঠিবে না এলা। ভোটের কাতা কন! ভোট দিয়া মোর জীবন চলিবে!’ বিপরীতে উছলপুকুরির নগেন দাস কিঞ্চিৎ আশাবাদী। হাত দিয়ে দেখালেন চারপাশ সবুজ হয়ে মাথা তুলেছে ভুট্টার আবাদ। আকাশের দিকে হাতজোড় করে নগেন বলেন, ‘ভগবান পুরা মাইর দ্যায় নাই।’
সেই আশানিরাশার দোলা। আলুর ক্ষতি যদি কিছু হলেও ভুট্টাতে পুষিয়ে দেয় ভগবান! ভোটও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে অনিশ্চয়তা। পেটের ভাতের, জীবিকার, শান্তিতে বসবাসের অনিশ্চয়তা। বেরিয়েছিলাম কোথায় কোন দলের শক্তি বেশি, কোন অঙ্কে কোথায় কীভাবে ভোট হবে, মানুষ ভোট নিয়ে কী ভাবছেন জানতে। সেসব ছাপিয়ে উত্তরবঙ্গের পথে পথে শুধু আলুর গল্প। যেসব গল্প খবরের কাগজে, টিভিতে এতদিনে বাসি হয়ে গিয়েছে।
বাসি হয়নি শুধু মানুষের মনের ক্ষত। দেওয়ানহাট থেকে জিরানপুর, বলরামপুর হয়ে তুফানগঞ্জের রাস্তাটার অধিকাংশ জায়গা ঝাঁ চকচকে। আমার গাড়ির সারথি বলছিলেন, ফালাকাটা-ধূপগুড়ি সড়কও এত চওড়া নয়। উত্তরবঙ্গের প্রায় সমস্ত রাস্তায় এখন গড়গড়িয়ে গাড়ি চলে। তাতে কী মশাই- পালটা প্রশ্ন করলেন দেওচড়াইয়ের এক দোকানদার। তাঁর যুক্তি, ‘বুঝলাম রাস্তা হয়েছে। আপনি এরপর বলবেন, দিদি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিয়েছেন। কিন্তু আমার ছেলেটা যে শ্রমিক হয়ে মহারাষ্ট্রে থাকে, তার জন্য একটি কাজ তো দিতে পারলেন না দিদি।’
ঘোর চৈত্রেও দিনহাটা ঢোকার মুখে রাস্তার পাশের জমিতে জল। প্রকৃতি কতটা অনিশ্চিত হলে এমন হয়! কামাখ্যাগুড়ি ঢোকার মুখে দেবেনবাবুর চৌপথিতে একদল শ্রমিকের সঙ্গে দেখা। হরিয়ানা থেকে ফিরছেন। ‘ভোট দিতে এলেন?’ মাধ্যমিক পাশ হরিহর সরকার বলেন, ‘গত লোকসভায় ভোট দিতে আসি নাই। অনেকদিনের হাজিরা মারা যায়। যাতায়াতের খরচই কত! গ্রামের লোক ফোনে বলল, এবার ভোট না দিলে তালিকায় নাম থাকবে না।’
সেই একই অনিশ্চয়তার গল্প। পরিযায়ী শ্রমিকদের ওই দলের সুধীর অবশ্য ভোট দিতে আসেননি। তাঁর নাম ডিলিটেড খাতায়। এলেন কেন? সুধীর বলেন, ‘বাড়ির লোক কইল ট্রাইবিউনালে যাওয়া লাগবে। ভোটার কার্ডখান না থাকলে যদি হরিয়ানার পুলিশ ধইরা নিয়া বাংলাদেশে পাঠায়া দ্যায়।’ ভয়, আতঙ্ক… অনিশ্চয়তাই ঘুরে ফিরে। চৈত্রের বৃষ্টি যেমন সর্বনাশ করেছে, তেমনই ভোট, এসআইআর, বিচারাধীন, ডিলিটেড তকমা জীবন যেন তছনছ করে দিয়েছে।
দিনহাটার কাছে মাতালহাটে নদীর ব্রিজের যে পাশে ভোটকেন্দ্র, সেখানকার অধিকাংশ লোকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ হয়ে গিয়েছে। তাঁদের কথায়, আমরা দিতে না পারলে ব্রিজের ওই পাড়ের লোকদেরও ভোট দিতে দেব না।’ নিজেেদর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কতটা আশঙ্কা থাকলে মানুষ এত বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে ভাবছিলাম। এসআইআর-এ একদল মানুষের ভবিষ্যৎ এমনই অনিশ্চিত।
ব্রিজের অন্য পাড়ের লোক কি সহজে ছেড়ে দেবেন? এত কষ্ট করে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যুদ্ধ করে পাওয়া ভোটাধিকার। মাতালহাটের রাস্তায় দুই দল মানুষের মনে দুই ধরনের আশঙ্কার মেঘ। পরিণতি? ভাবতে গায়ে কাঁটা দিল। উত্তরবাংলার পথেপ্রান্তরে হঠাৎ মেঘ-বৃষ্টি ও রোদের হেসে ওঠার মতো মানুষের মুখে কতরকম আশঙ্কার যে চর্চা! সিতাইয়ের পথে ভোলাচাতরায় যাঁর সঙ্গে দেখা হল, সেই কৃষক মুখে বললেন, পদ্মফুলের হাওয়া চারদিকে।
কিন্তু তারপরই যে কথা বললেন, তাতে স্পষ্ট তিনি তৃণমূল সমর্থক। ততক্ষণে চাউর হয়ে গিয়েছে, বিজেপির নির্বাচনি ইস্তাহারে মহিলাদের মােস ৩০০০ টাকা ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভদ্রলোকের কথায়, ‘দিদি এত দিলেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী… তাও এখন গ্রামের লোক কওয়ার ধরছে, মোদি তো ৩০০০ দিবে কইছেন।’ উনি বোঝাতে চাইলেন, একটু বেশি ভাতার আশায় কীভাবে মানুষের মুড বদলে যাচ্ছে। মুডও অনিশ্চিত।
সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশে মেঘ। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মেঘের আড়ালে সূর্য ডুবছে। শীতলকুচির কাছে গোলকগঞ্জে চরাচরজুড়ে তখন শূন্যতা। বাজারের এক ওষুধের দোকানদার বললেন, ‘ভোটটা তো হয়ে যাবে ২৩ তারিখ। ৪ মে জানা যাবে, কোন দল সরকার করবে। তারপর কী হবে- এটাই এখন আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের বড় চিন্তা। একই দুশ্চিন্তার খবর শুনলাম দিনহাটায়। তাঁদের মনে দগদগ করছে সেই ভয়ংকর স্মৃতি- ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তৃণমূল অনেক দোকানের শাটার নামিয়ে দিয়েছিল।
আবার সেই দিন ফিরবে না তো? দিনহাটার মদনমোহন মন্দিরপাড়ায় পরিচিত এক শিক্ষকের কথায়, ‘ভোট যত আসছে, তত বুক কাঁপছে। এরপর কী?’ শুধুই ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা!

