রাহুল দেব, রায়গঞ্জ: মেয়েদের স্বনির্ভরতার দিশা দেখিয়ে তিনি একাই যেন হয়ে উঠেছেন আস্ত একটি প্রতিষ্ঠান। রায়গঞ্জ (Raiganj) শহর ও আশপাশের এলাকার শতাধিক মেয়েকে সেলাই শিখিয়েছেন তিনি। গত তিন দশকে তাঁর কাছে কাজ শিখে রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছেন বহু তরুণী ও গৃহবধূ। তিনি চন্দ্রা দত্ত। রায়গঞ্জের রমেন্দ্রপল্লিতে বাস এই সেলাই দিদিমণির। বয়স সত্তরের চৌকাঠে। তবে শুধু প্রশিক্ষিকাই নন, নিজেও এখনও তিনি সেলাইয়ের কাজ করেন। কেউ বানাতে দিলে চুড়িদার, ব্লাউজ বা কুর্তি বানান। এই বয়সেও মেশিনে তাঁর হাত ও পা চলে সমান তালে। পুজোর আগে কাজের চাপে রাত জাগেন চন্দ্রাদেবী। সবার চাহিদা অনুসারে অর্ডার ও ডেলিভারির চাপ সামলাতে গিয়ে রাত কখন ভোর হয়ে যায়, টেরই পান না।
সেলাই দিদিমণি হিসেবেই পরিচিত বেশি চন্দ্রাদেবী। হবে নাই বা কেন? টানা ৬০ বছর ধরে একের পর এক মেয়েদের হাতে ধরে সেলাইয়ের কাজ শিখিয়েছেন তিনি। যাঁদের নিজের হাতে সেলাই শিখিয়ে স্বাবলম্বী করেছেন, তাঁদের কারও কাছে তিনি ‘চন্দ্রা মা’, কারও কাছে ‘চন্দ্রাম্মা’। কেউ আবার ডাকেন চন্দ্রা কাকি বলে। তাঁর এক ছাত্রী উমা দেব জানান, ‘ওঁনার কাছেই আমার সেলাইয়ের কাজে প্রথম হাতেখড়ি। এখন আমার নিজস্ব লেডিস টেইলরিংয়ের দোকান রয়েছে।’


কৃষ্ণা সাহার বড়সড়ো টেইলরিংয়ের দোকান রায়গঞ্জ শহরেই। তাঁর কথায়, ‘চন্দ্রা কাকির হাত ধরে রায়গঞ্জে প্রচুর লেডিস টেইলর উঠে এসেছেন। আমিও তাদের মধ্যে একজন। নিজে স্বাবলম্বী তো হয়েছিই, এখন দোকানে কর্মচারী রেখে তাঁদেরও রোজগারের উপায় করে দিতে পারছি।’
চন্দ্রাদেবীর জার্নিটা শুরু হয়েছিল সেই সাত বছর বয়সে। বাবা মাখনলাল চৌধুরী ছিলেন সেই সময়ের নাম করা দর্জি। তাঁর কাছেই ছোট্ট বয়সে সেলাইয়ের কাজ শেখা শুরু। বড় হয়ে এই কাজকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। বিয়ে হয় শহরেরই নাম করা টেইলর সুবলচন্দ্র দত্তর সঙ্গে। বিয়ের পর থানা রোডের সেই ‘দত্ত টেইলর’ হয়ে ওঠে চন্দ্রাদেবীর কর্মস্থল। বয়সের ভারে খানিকটা ন্যুব্জ হওয়ায় এখন আর সেই দোকানে বসেন না তিনি। বাড়িতেই কাজ করতে করতে স্মৃতিচারণ করে চন্দ্রাদেবী বলেন, ‘তখন সত্তরের দশক। নকশাল আমল। নানা জনের নানারকম টিটকিরি সহ্য করেও স্বামীকে সাহায্য করতে গভীর রাত পর্যন্ত সেলাইয়ের কাজ করেছি। স্বামী পাশে ছিলেন বলেই অগুনতি ছেলেমেয়েকে কাজ শিখিয়ে স্বনির্ভর করতে পেরেছি। আজ এই বয়সে এসে এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দেয়।’

