- রুমি বাগচী
গত কয়েক বছর ধরে যে অস্বস্তি ছিলই, সেটাই আরও বেড়েছে। বিদেশি ছাত্রদের বিশেষ করে চিনা ছাত্রদের আমেরিকান ভিসার কড়াকড়ি আরও বাড়ানো হচ্ছে। এখন ব্যাপার হচ্ছে, এতে উষ্মা তখনই হবে যদি সেই দেশে যাওয়ার ইচ্ছেটা তীব্র হয়। দেখা গিয়েছে, মুখে যতই নিন্দা করুক, শুধু চিন দেশই নয়, পৃথিবীর অনেক দেশই আমেরিকায় আসতে অত্যন্ত আগ্রহী। আর সেইজন্যই ভিসার কড়াকড়ি নিয়ে বিতর্ক!
মুখে আমেরিকার প্রতি আগ্রহ খুব একটা শোনা যায় না। সবাই-ই প্রায় চুপচাপ ভিসার জন্য আবেদন করে ইন্টারভিউ-এর ডাক আসার জন্য অপেক্ষা করেন। নইলে প্রত্যেক বছর কি আর লক্ষ লক্ষ ভিসার আবেদন জমা পড়ে? ২০২৪–এ ১১ লক্ষ ৫০ হাজার ভিসা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে স্টুডেন্ট ভিসা ৪ লক্ষ ৪৬ হাজার। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতি বছর আমেরিকায় ভিসার আবেদনপত্রের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বেড়েই চলেছে।
এই স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে আসা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কোন দেশ সবচেয়ে বেশি? সবচেয়ে বেশি ভারত। তারপরই চিন। এছাড়া ব্রাজিল, মেক্সিকো, কোরিয়া, জাপান ও ইংল্যান্ড থেকেও সব মিলিয়ে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী আসেন। সাধারণত উন্নতশীল দেশের ধনীরা উন্নত দেশে চলে যেতে চায়। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমেরিকাতে ছাত্রছাত্রীদের আসার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। সেটা কেন?
তার বেশ কয়েকটি জোরালো কারণ আছে। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষ স্তরের। গবেষণার দারুণ সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধে, আর দক্ষ ও প্রতিভাবান শিক্ষক। এখানেও শেষ নয়। বিভিন্নরকমের প্রোগ্রাম ও নানা ধরনের বিষয় নিয়ে পড়াশোনার সুবিধে। এছাড়া আমেরিকার ডিগ্রির গোটা দুনিয়ায় দারুণ দাম পায়। ফলে, জীবন ও জীবিকার এক উন্মুক্ত উজ্জ্বল সম্ভাবনা। ইংরেজি বলিয়ে কোনও দেশে পড়াশোনা করলে ইংরেজিটাও উন্নত হয়, যেটা আন্তর্জাতিক চাকরির জগতে খুবই প্রয়োজন। এসব ছাড়াও আমেরিকার মূলশক্তি উদ্ভাবনী ক্ষমতা। প্রযুক্তি, ওষুধ, ব্যবসা ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বলা যেতে পারে আমেরিকাই সারা বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই বাইরের দেশে যাব যখন এক নম্বর দেশেই যাব, এমন একটা মনোভাব অনেকের মধ্যেই কাজ করে।
এরপরও আরও একটি ব্যাপার আছে। আমেরিকায় গোটা পৃথিবীর মানুষ থাকেন। এখানে নিজেকে আলাদা করে বিদেশি তেমন একটা মনে হয় না। কারণ সবাই বিদেশি। কিন্তু নানা দেশের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার একটা অমূল্য সুযোগ পাওয়া যায়। জীবনটা এক মুহূর্তে অনেক বিস্তৃত হয়ে যায়। যার থেকে পাওয়া যায় আত্মবিশ্বাস। যেমন, আমার অফিসে ককেশিয়ান ছাড়াও ফিলিপিনো, মেক্সিকান সহকর্মীরা আছেন। আছেন ব্রিটিশ, ব্রাজিলিয়ান। এমনকি চিলিয়ানও আছেন। এঁরা সবাই আমাকে এক বৃহত্তর জগতের স্বাদ দেন। ব্রাজিলের গল্প শুনি। মেক্সিকান খাবার, ফিলিপিনো খাবার ভাগাভাগি করে খাই। মনে হয় এক বিশ্ব আঙিনায় বসবাস করছি।
এছাড়া চিনা তো প্রচুর। একই ব্যাপার ঘটে পাড়াপ্রতিবেশীদের ক্ষেত্রেও। চিনারা তাঁদের সন্তানদের আমেরিকায় পড়তে পাঠানোর ব্যাপারে মরিয়া। ক্লাস ফাইভ, সিক্সেই ছেলেমেয়েকে কোনও বাড়িতে পেয়িং গেস্ট করে পাঠিয়ে দেওয়ার চল আছে। কখনও সন্তানকে নিয়ে মা এখানে চলে এসে আলাদাভাবে থাকেন। আর বাবা চিন থেকে টাকা পাঠান। এই মুহূর্তে ৫০ লক্ষ চিনা এ দেশে বসবাস করছেন। তবে ওঁদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আরও একটু অন্যরকম। ইকসুয়ান দং চিনের জগদ্দল পরীক্ষা থেকে বাঁচতে ক্লাস নাইনেই আমেরিকায় চলে এসেছে। মুখস্থবিদ্যার ওপর অতিরিক্ত চাপ, প্রযুক্তির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচতে আমেরিকায় এসে সে যেন মুক্তি খুঁজে পেয়েছে। এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নমনীয়তা, বিধিনিষেধহীন প্রযুক্তির ব্যবহারে ইকসুয়ান ভীষণই খুশি। চিনা মেয়ে লিউ ইয়াকিয়ান চিনের কলেজের কঠোর প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘গাওকাও’ না দিয়ে আমেরিকায় চলে এসে হার্ভার্ডে সুযোগ পেয়েছে। ফলিত অঙ্ক ও ইকনমিক্স নিয়ে পড়ছে সে। চিনে সন্তানকে আমেরিকায় পড়তে পাঠানো ধনীদের একটি স্ট্যাটাস সিম্বল। এটি একটি অদ্ভুত অবস্থা যখন চিনারা বিপুল অর্থ খরচ করে তাঁদের একমাত্র সন্তানকে এমন একটি দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন যার সঙ্গে শাসকদলের সম্পর্ক ভালো নয়! খোদ বেজিং- এই কিছু কোম্পানি আছে যারা অর্থের বিনিময়ে চিনা ছাত্রছাত্রীদের আমেরিকার স্কুল-কলেজে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করে।
এই মুহূর্তে ভারতীয় ছাত্র আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি হলেও চিনারা কিন্ত ভারতীয়দেরও অনেক আগে আমেরিকায় আসে। আমেরিকার প্রতি চিনাদের এই আকর্ষণ প্রথম শুরু হয়েছিল যখন ১৮৫০ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে সোনার খোঁজ মেলে। সোনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাঁরা রেললাইনের কাজে লেগে যায়। এরপরের অর্ধশতক নীতিগত পার্থক্যের জন্য চিন ও আমেরিকা পরস্পরকে সহজে ভিসা দিত না। পরে যেই ভিসার কড়াকড়ি কমল, অমনি অবিরত চিনা ঢেউ আসতে লাগল আমেরিকায়। ২০১৫–তে চিনা ছাত্রছাত্রীদের এই আগমনের জন্য আমেরিকার ১১ বিলিয়নের মতো ডলার প্রাপ্তি হয়েছিল।
এই অবস্থায় মাত্র কিছুদিন আগে আমেরিকার নতুন সরকার বিদেশি ছাত্রদের ওপর নিয়মনীতি কঠোর করল। বিশেষ করে চিনা ছাত্রছাত্রীদের ওপর বেশি। বাইরের দেশের ছাত্ররা যে নিয়মকে অঙ্গীকার করে আমেরিকায় প্রবেশ করতেন, কিছুদিন পরেই সেগুলো লঙ্ঘন করছিলেন। তার মধ্যে প্রধান হল, রোজগার করতে শুরু করা। যা নিয়মবিরুদ্ধ। তুমি নিজের ইচ্ছেয় যে দেশে এসেছ, সে দেশের নিয়ম তো তোমাকে মানতে হবেই।
তাই আমেরিকান প্রশাসক স্থির করেছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আমেরিকায় থাকার সময়কাল সীমিত করা হবে এবং তাঁদের আচার-আচরণের ওপর নজর রাখা হবে। বিশেষ মেধা ও দক্ষতা না থাকলে, পড়াশোনা শেষের পরই এ দেশ ছাড়তে হবে। চাকরি করে সহজে এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেওয়া হবে না। যদি কোনও বিষয়ের সমস্ত ক্লাস অনলাইন হয়, তবে তাঁকে অযথা এদেশে থাকার দরকারই নেই। অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য শিক্ষাগত ভিসার মাধ্যমে সহজে এদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করাকে আটকানো। আমেরিকার সম্পদ ও সংগতির ওপর আমেরিকান নাগরিকদেরই প্রথম অধিকার।
চিনা শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি কড়া মনোভাব কেন? জাতীয় নিরাপত্তার কারণে। যে দেশের সরকারের সঙ্গে মার্কিন সরকারের সম্পর্ক ভালো নয়, সে দেশের নাগরিকদের ওপর নজর রাখার দরকার বলে মনে করা হচ্ছে। প্রযুক্তি ও দেশের অন্য সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোয় চিনা শিক্ষার্থীদের অ্যাডমিশনের সুযোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের চিন কমিউনিস্ট পার্টি ও চিনা সেনাবাহিনীর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে বা কখনও ছিল। তবে আমেরিকার নতুন প্রশাসকের এইসব নীতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কোম্পানি মামলা করছে। দেখা যাক, প্রশাসন তার অবস্থান কীভাবে ও কতটা নরম করে। নাকি নিজের অবস্থানেই শেষপর্যন্ত অনড় থাকে।
(লেখক শিলিগুড়ির ভূমিকন্যা। লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দা)



