কৌশিক দাস
জলপাইগুড়ি জেলার ক্রান্তি ব্লকের লাটাগুড়িতে একটি উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। সেই দাবি পূরণে উদ্যোগী হন তৎকালীন কয়েকজন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও এলাকাবাসী। সকলের নিরন্তন প্রচেষ্টায় ২০০০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবিত লাটাগুড়ি জুনিয়ার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শিক্ষা দপ্তরের অনুমোদন নিয়ে পথচলা শুরু। ২০০০ সালে যে শিশু জন্ম নিয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই লাটাগুড়ি উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী পূর্তিতে গর্বিত পড়ুয়া, শিক্ষক ও প্রাক্তনীরা।
২০০১ সালে অর্চিতা সিহি ও সাধনা দাস নামে দুজন শিক্ষিকা হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগ দেন। তখন ক্লাস হত পার্শ্ববর্তী লাটাগুড়ি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। সেসময় পড়ুয়া সংখ্যা ছিল ৬৫০। ২০০২ সালে বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন লিপিকা সুকুল। ২০০৩ সালে স্কুলের বর্তমান ভবনটি স্থাপিত হয়। এখন সমস্ত বিভাগ মিলিয়ে ১২৬৪ জন ছাত্রী রয়েছে। একজন ভারপ্রাপ্তকে নিয়ে স্থায়ী পদে ১২ জন এবং ৫ জন পার্শ্বশিক্ষিকা রয়েছেন। এছাড়া পাঁচজন ২০১৬ সালের প্যানেলভুক্ত চাকরিহারা শিক্ষিকা ক্লাস নেন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মীসংখ্যা মাত্র এক। অর্থাৎ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী, উভয় সংকটে ভুগছে বিদ্যালয়টি।
সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসের শোভা বাড়িয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি। খেলাধুলোর প্রতি পড়ুয়াদের বিশেষ আগ্রহ দেখে স্কুলেই কুংফু ও ক্যারাটে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। চত্বরে তৈরি হয়েছে বাস্কেটবল কোর্ট। সম্প্রতি কস্তুরবা গান্ধি ছাত্রী আবাসের আবাসিক তৃষা রায় নর্থবেঙ্গল কুংফু চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতেছে। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা সোমা গুহ বলছিলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চাতেও উৎসাহ দেওয়া হয় পড়ুয়াদের। সারাবছরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আগে নাচ, গানের তালিম দেন শিক্ষিকারা। প্রায় প্রতিবছর বহু পড়ুয়া জেলা ও রাজ্যস্তরের একাধিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। অনেকে পুরস্কার জিতে গর্বিত করে স্কুলকে। পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, কম্পিউটার ক্লাস, ভূগোলের ল্যাবরেটরি আছে। স্মার্ট ক্লাসরুমও তৈরি হচ্ছে। তবে পরিকাঠামোগত কিছু খামতি রয়ে গিয়েছে।’
কী সেটা? সোমা জানালেন, বিদ্যালয়ের মূল ভবনের তিনতলায় ঘরে টিনের ছাউনি রয়েছে। সেখানে ছাদ ঢালাই করা গেলে ভালো হয়। এছাড়া বিদ্যালয়ে একটি অডিটোরিয়াম তৈরি হলে অনুষ্ঠান আয়োজনে সুবিধা হত।
স্কুল ঘুরে দেখতে দেখতে কথা হচ্ছিল নবম শ্রেণির পড়ুয়া পারিজাত ঘোষের সঙ্গে। তাঁর অভিজ্ঞতা, ‘একদিনও স্কুল মিস করতে ইচ্ছে করে না। দিদিমণিরা তো খুবই ভালো। বকেন, আবার আদরও করেন। সবকিছুতে উৎসাহ দেন। ওই স্মার্টক্লাসটি চালু হলে আরও ভালো হবে। বইয়ে যা পড়েছি, বড় পর্দায় সব দেখতে পারব। সেই মজা হবে।’
দ্বাদশ শ্রেণির অঙ্কিতা তুরির কথায়, ‘এক বছর ধরে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলবে। আমি অনেকগুলোতেই অংশ নিচ্ছি।’ অঙ্কিতার মতো রজত জয়ন্তীর অনুষ্ঠান নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল দ্বাদশ শ্রেণির গার্গী রায়, প্রাক্তন পড়ুয়া কৃষ্ণা রায় ও বান্টি বর্মনদের সঙ্গে আলাপচারিতায়।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী ছাত্রী তুহিতা ঘোষের বক্তব্য, ‘এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষিকা পড়ুয়াদের সন্তানের চোখে দেখেন। তাদের আগলে রাখেন। আমি স্কুলে থাকাকালীনও অডিটরিয়াম কিংবা বড় হলঘরের অভাব বোধ করেছি। এতে সংস্কৃতিচর্চায় সমস্যা হয়। আধুনিক মানের একটি গ্রন্থাগারও চাই। সেখানে আরও আরও বই থাকবে। প্রশাসন ও স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি এই দুটো বিষয়ে নজর দেয়, তবে প্রান্তিক এলাকার মেয়েরা উপকৃত হবে।’
অপর প্রাক্তনী অন্তরা বসুর পরামর্শ, ‘বর্ষাকালে ক্যাম্পাসে জল জমে। সেটার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষিকার ঘাটতি তো সকলেরই জানা। ভালোমানের শিক্ষাদানে আরও শিক্ষিকা নিয়োগ করতে হবে।’

