(আগামীর কর্মসংস্থানে বড় দিশা দেখাচ্ছে এভিজিসি সেক্টর, যেখানে সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে খুলে যাচ্ছে ভবিষ্যতের এক নতুন দিগন্ত।)
চিরদীপা বিশ্বাস
ল্যুসেন্টের ম্যারাথন সিরিজটা দেখে নিস, ব্যাস কেল্লা ফতে! বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই পরামর্শ এখন অতি পরিচিত। পাঁচ-ছয় বছর আগেও অনলাইন ক্র্যাশ কোর্স বা ভিডিও লেকচারের ধারণা এতটা জনপ্রিয় ছিল না। কোভিড আবহে ডিজিটাল শিক্ষার যে দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল, আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ঘরে বসে অনায়াসেই চলছে এনআইআইটি বা ইউপিএসসির প্রস্তুতি। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রার মূলে রয়েছে ‘কনটেন্ট’। এই ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দিয়েই ২০২৬-এর কেন্দ্রীয় বাজেটে ‘এভিজিসি কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব’ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা আগামীদিনে কর্মসংস্থানের এক অত্যন্ত দৃঢ় ভিত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে।
বিনোদন থেকে সম্মানজনক পেশা
আজকের ‘আন্তর্জালিকতাবাদ’-এর যুগে ভিডিও তৈরি করা কেবল অবসরযাপন নয়, বরং এক সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। জাতীয় স্তরে সমাজমাধ্যম প্রভাবীদের সংবর্ধনা প্রদান তারই প্রমাণ। প্রথম সারির কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাফল্য এবং জীবনযাপন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বড় অনুপ্রেরণা। তবে দ্রুত খ্যাতি ও অর্থ উপার্জনের নেশায় অনেক সময় ‘ট্র্যাশ’ বা নিম্নমানের বিষয়বস্তু সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা ক্ষতিকর। প্রস্তাবিত ল্যাবগুলির সার্থকতা তখনই আসবে, যখন যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্রিয়েটরদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং গুণমান সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব হবে।
সৃজনশীলতা ও কঠিন বাস্তব
কনটেন্ট ক্রিয়েশন নিয়ে আমাদের সমাজের একাংশের নাক সিঁটকানো আজও মজ্জাগত। ক্যামেরা হাতে কাউকে দেখলে বিদ্রূপ করা যতটা সহজ, অ্যালগরিদম ও ট্রেন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি মানসম্মত তথ্যমূলক বা বিনোদনমূলক ভিডিও বানানো তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন। এটি কেবল ‘হ্যালো গাইজ’ বলা নয়, বরং নিপুণ সম্পাদনা এবং সৃজনশীল ভাবনার এক জটিল সংমিশ্রণ। তাই কম্পিউটার বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে বাহবা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কেউ যদি এই মাধ্যমকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চায়, তবে তাকে তুচ্ছজ্ঞান না করে বরং উৎসাহ প্রদান করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নতুন দিগন্ত
বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বপ্ন এবং পেশার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গ্রাফিকস ডিজাইনিং থেকে শুরু করে এআই-এর সাহায্যে অডিও-ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং- সৃজনশীলতার গণ্ডি এখন অনেক বেশি বিস্তৃত। ল্যাব তৈরির এই সরকারি উদ্যোগকে কেবল ‘বিলাসিতা’ ভাবলে ভুল হবে। বরং এটি প্রযুক্তির সঙ্গে সৃজনশীল প্রতিভার সেতুবন্ধন। আজকের জগৎ তথ্যের জগৎ, আর সেই তথ্যকে যাঁরা আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন, ভবিষ্যৎ বাজার তাঁদেরই দখলে থাকবে। প্রযুক্তির এই হাতিয়ারকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে তা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
দায়বদ্ধতা ও আগামীর প্রত্যাশা
তবে যে কোনও উদ্যোগেরই কিছু অন্ধকার দিক থাকে। নির্বাচনি প্রচার হোক বা কোনও নির্দিষ্ট প্রোপাগান্ডা বিস্তার- বর্তমান যুগে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের মাহাত্ম্য অপরিসীম। তাই লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন, এই ল্যাবগুলি যেন কোনও বিশেষ রাজনৈতিক রঙের কবলে না পড়ে। সৃজনশীলতা হোক নিরপেক্ষ এবং মুক্ত মনের বহিঃপ্রকাশ। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করে যদি প্রকৃত শিল্পী ও কারিগর তৈরি করা যায়, তবেই এই ডিজিটাল সংস্কার সার্থক হবে। আগামীর পৃথিবী হবে সৃজনশীল কারিগরদের, যেখানে মেধা আর প্রযুক্তির মেলবন্ধনে রচিত হবে নতুন সাফল্যের গাথা। বাকিটা সময়ের ওপর নির্ভরশীল।
(লেখক সংস্কৃতিকর্মী। কোচবিহারের বাসিন্দা।)

