কোচবিহার শহরের এলাকাগুলির নামকরণের সঙ্গে অতীত ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। তেমনি একটি এলাকা হল হাজরাপাড়া। এলাকাটির নামকরণ নিয়ে বেশ কয়েকটি কাহিনী প্রচলিত। যা রাজআমলের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। আজ হাজরাপাড়ার পুরোনো রূপ নেই, হাতি, ঘোড়া দেখা যায় না। দেখা যায় না কাঠের বাড়ি। তার জায়গায় উঠেছে বড় ইমারত। এলাকার উন্নয়ন ঘটলেও নামের কিন্তু বদল ঘটেনি।
তন্দ্রা চক্রবর্তী দাস, কোচবিহার: সে অনেক কাল আগের কথা। তখন রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকত কোচবিহারে (Cooch Behar)। রাজনগরের দক্ষিণ দিকে যে রাস্তাটার নাম এখন বিশ্বসিংহ রোড, এক সময় তার নাম ছিল গুদাম মহারানিগঞ্জ রোড। সেই রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগোলেই হাজরাপাড়া (Hajrapara)। জনশ্রুতি রয়েছে রাজ আমলে এই অঞ্চলে একসময় বিভিন্ন কাজের হাজিরা নেওয়া হত। এই থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয় হাজিরাপাড়া। পরবর্তীতে লোকমুখে যা হাজরাপাড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। তবে এটি ছাড়াও হাজরাপাড়া নামকরণের বেশ কয়েকটি কাহিনী প্রচলিত রয়েছে।
তখনও পূর্ব পশ্চিমে ভাগ হয়নি হাজরাপাড়া। জনবসতিও ছিল তুলনায় অনেকটাই কম। ১৯২৭-’২৮ সাল নাগাদ বর্তমান যেটা হাজরাপাড়া মোড়, সেখানে বাড়ি করেন চিকিত্সক রাধাচরণ রায় কর্মকার। রাধাচরণ রাজমাতার নিজস্ব গৃহ চিকিৎসক ছিলেন। রাজবাড়ি থেকে হাতি এনে প্রতিদিন তাঁকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যেত। হাজরাপাড়ার প্রাচীন বাসিন্দা বলতে তাঁর বংশধররা এখনও এই এলাকায় রয়েছেন। তাঁর নাতনি চিত্রলেখা রায় পাল বলছেন, “দাদু-ঠাকুমার মুখে হাজরাপাড়ায় হাজরা পদবিযুক্ত কেউ কখনও আছে বলে শুনিনি। তাই এই এলাকায় হাজরা পদবিধারীদের বসবাস থেকে ‘হাজরাপাড়া’ নামটি এসেছে এই কথাটা মনে করা হয়তো ঠিক হবে না।” শুধু তাই নয়, হাজরাপাড়া এলাকার বেশ কয়েকজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেল হাজরা পদবিধারী কেউ কখনও এই এলাকায় ছিলেন না।
হাজরাপাড়া নামকরণ নিয়ে ইতিহাসের গবেষক স্বপনকুমার রায়ের বক্তব্য, ‘উপযুক্ত সেরকম কোনও তথ্যপ্রমাণ না থাকলেও এই এলাকায় এক সময় হাজিরা নেওয়া হত এই কথাটি ঠিক। সেই থেকে হাজরা শব্দটি আসতে পারে। হরেন্দ্রনারায়ণ রোড দিয়ে কিছুটা এগিয়ে ছিল একসময়ের কোচবিহারের শ্মশান। সেই শ্মশান পাহারা বা শ্মশানে হাজিরা দেওয়ার জন্য কিছু লোক সেখানে থাকতেন। তা থেকেও হাজরাপাড়া নামটি আসতে পারে।’
রাজ আমল এবং তার পরবর্তীতেও হাজরাপাড়া মোড়ে কাঠের বাড়ি ছিল বলে অনেকে বলছেন। অনুমান, সেখানে রাজ আমলে হাজিরা নিতে আসতেন বিভিন্ন কর্মচারী। পরবর্তীতে সেই বাড়িটি হারিয়ে যায়। এই বিষয়ে অন্য একটি মত রয়েছে, সেখানে হাজিরা গাছের কথা বলা হচ্ছে। হাজিরা এক ধরনের আয়ুর্বেদিক গাছ। এই গাছের আধিক্য থাকায় ওই এলাকার নাম হাজিরাপাড়া হয়েছে। যা পরবর্তীতে হাজরাপাড়া হয়েছে। তবে এই মতের সপক্ষে তেমন জোরালো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। তার কারণ ওই এলাকায় হাজিরা গাছ দেখেছেন এরকম বয়স্ক কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
হাজরাপাড়া কোচবিহার পুরসভার (Cooch Behar Municipality) ১৫ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডজুড়ে অবস্থিত। একসময় লোকবসতি কম থাকলেও বর্তমানে হাজরাপাড়াতে কোনও ফাঁকা জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বেশিরভাগ পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে। রাধাচরণের বাড়িও সদ্য ভাঙা পড়ল। সেখানেও উঠছে বহুতল। হাজরাপাড়া ভাগ হয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম হাজরাপাড়ায়। হরেন্দ্রনারায়ণ রোডের মাথায় ১৯৫৪ সালের বন্যার পর বাঁধ হয়েছে। দোকান, শোরুমে জমজমাট হাজরাপাড়া আজও নিজের নামের অর্থ খুঁজে বেড়ায়।

