কোচবিহার জেলায় প্রায় জনা চল্লিশেক মেয়ে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সীমিত পরিকাঠামোতে প্রশিক্ষণ চললেও তাঁদের স্বপ্ন ছোঁয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিকাঠামো ও প্রচারের অভাব। ফলে তাঁদের মনোবল ধরে রাখা ও নিয়মিত মাঠে নিয়ে আসাটাই যেন প্রধান চ্যালেঞ্জ। জেলায় মহিলা ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থা শিবশংকর সূত্রধরের কলমে।
শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: বড় হয়ে কী হতে চাও? কয়েক বছর আগে প্রতিবেশী এক কাকু ঠিক এই প্রশ্নটিই করেছিল স্কুল পড়ুয়া দেবলীনাকে। সে জবাব দিয়েছিল, ‘ক্রিকেটার হব।’ উত্তর শুনে সেই প্রতিবেশী কাকুর মুখে তখন তিরস্কারের হাসি, যে হাসি ভালো লাগেনি দেবলীনার। এখনও মনে রেখে দিয়েছে সেই বাঁকা হাসির কথা। রিচা ঘোষদের বিশ্বজয়ই যেন সেই হাসির যোগ্য জবাব। তাই একাদশ শ্রেণির দেবলীনা অধিকারীকে এখন কেউ সেই একই প্রশ্ন করলে তার জবাবে যুক্ত হয় রিচার নাম। জবাব মেলে ‘বড় হয়ে ক্রিকেটার হব, রিচা ঘোষের মতো।’
বুধবার বিকেলে কোচবিহার স্টেডিয়ামে দেখা গেল ক্রিকেটের অনুশীলন চলছে। সেখানেই দেবলীনা বলল, ‘তিন বছর ধরে আমি ক্রিকেট শিখছি। রিচা ঘোষ আমাদের অনুপ্রেরণা।’ একইভাবে নবম শ্রেণির জাহ্নবী থাপাও ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সে কোচবিহার-২ ব্লকের গোপালপুর থেকে কখনও বাসে, কখনও বা অটোতে চেপে কোচবিহার শহরে এসে ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
দেবলীনার মতো কোচবিহার (Cooch Behar) জেলায় প্রায় জনা চল্লিশেক মেয়ে রয়েছে যারা ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। যারা ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ নেয় জেলা ক্রীড়া সংস্থায়। সীমিত পরিকাঠামোতে প্রশিক্ষণ চললেও তাদের স্বপ্ন ছোঁয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিকাঠামো ও প্রচারের অভাব। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের মেয়েদের ক্রিকেট লিগে কোচবিহার জেলা দল অংশ নেয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য নেই। জেলা স্তরে মেয়েদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের সংখ্যা কম। মেয়েদের ক্লাব লিগ হয় না। ফলে প্রতিভা দেখানোর জায়গা কোথায়?
স্বাভাবিকভাবে হাতেগোনা যে ক’জন মেয়ে ক্রিকেটের তালিম নিচ্ছে তাদের মনোবল ধরে রাখা ও নিয়মিত মাঠে নিয়ে আসাটাই যেন প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকারও করে নিয়েছেন কোচ ধ্রুবজ্যোতি মোহন্ত। তাঁর কথায়, ‘প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে দেখেছি সেখানে একটানা ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকার মানসিকতা তুলনামূলক কম রয়েছে। এজন্য দরকার প্রতিটি জায়গায় মেয়েদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা। যত বেশি খেলা হবে তত প্রতিভা উঠে আসবে।’
জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনজন কোচ রয়েছেন। সাধারণত প্রতি শনি ও রবিবার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও কিছুদিন পরেই আন্তঃজেলা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট থাকায় প্রতিদিনই অনুশীলন চলছে। কয়েক বছর আগে এখান থেকে উঠে আসা সঞ্চিতা অধিকারী বাংলা দলের হয়েও খেলেছে। ফলে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে ভালো ক্রিকেটার উঠে আসার সম্ভাবনা প্রচুর। একসময় রিচা কোচবিহার স্টেডিয়ামে খেলে গিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সুস্মিতা রায় এখন কোচবিহারে মেয়েদের কোচ। সুস্মিতার কথায়, ‘ভালো ক্রিকেটার তুলে আনার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ক্লাব লিগের আয়োজন করতে হবে।’
শেষ কয়েক বছরে ক্রিকেটের পরিকাঠামো ভালো হয়েছে বলে দাবি করেছেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সচিব সুব্রত দত্ত। তাঁর কথায়, ‘মাঠের পাশাপাশি ইন্ডোরে প্রশিক্ষণ, বোলিং মেশিন চালু করা হয়েছে। জেলাগুলিতে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রসারের জন্য সিএবিকে আরও বেশি করে উদ্যোগী হতে হবে। ক্লাবগুলি যদি এগিয়ে আসে তাহলে অনেক ক্রিকেটার উঠে আসবে। সারাবছর ধরে অনুশীলনের প্রয়োজন।’

