গৌরহরি দাস, কোচবিহার: আলিপুরদুয়ার শহর থেকে আলিপুরদুয়ার জংশন (Alipurduar Junction) পর্যন্ত রেলপথটি তুলে দিতে সওয়াল করছেন সেখানকার পদ্ম ও ঘাসফুল শিবিরের একাংশ রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন সংগঠন। দু’দিন আগে এই নিয়ে আলিপুরদুয়ারে একটি বৈঠকও হয়েছে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের আধিকারিকদের কাছে স্মারকলিপিও জমা পড়েছে। আর এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছে কোচবিহার (Cooch Behar) জেলার বিভিন্ন সংগঠন। তাদের দাবি, ঐতিহ্যবাহী এই রেলপথটি কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের তৈরি। রেলমন্ত্রক এটিকে ‘মহারাজা রেলওয়ে’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই গৌরবময় ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে রেলপথটিকে সংরক্ষণ করে আরও ভালোভাবে চালানো দরকার। সেই জায়গায় স্থানীয় ঠুনকো স্বার্থের জন্য রেলপথটিকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
বামনহাট থেকে কোচবিহার, বাণেশ্বর হয়ে আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) শহর দিয়ে জংশন হয়ে রাজাভাতখাওয়া যাওয়া এই রেলপথটি মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের তৈরি। কোচবিহার হেরিটেজ সোসাইটির সম্পাদক অরূপজ্যোতি মজুমদার বলেছেন, ‘এর সঙ্গে কোচবিহার ও কোচবিহারবাসীর আবেগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মহারাজার স্মৃতিবিজড়িত এই রেলপথটি যাঁরা তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা নিজেদের স্বার্থে ইতিহাসকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন। এটা কোচবিহারবাসী কোনওভাবেই মেনে নেবেন না। খুব শীঘ্রই বিষয়টি নিয়ে আমরা রেলমন্ত্রীর দ্বারস্থ হব।’
কোচবিহার-দিনহাটা রেলযাত্রী মঞ্চের তরফে রাজা ঘোষ বলেন, ‘মহারাজার স্মৃতিবিজড়িত এই পথটির হেরিটেজ সম্মান পাওয়া উচিত। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর মাল পরিবহণ ও ১৮৯৪ সালের ১ মার্চ যাত্রী পরিবহণ শুরু হয় গিতালদহ হাট ও তোর্ষা (এখনকার ঘুঘুমারি) স্টেশনের মধ্যে। পরবর্তীতে বাণেশ্বর স্টেশনের মাধ্যমে এটি আলিপুরদুয়ার হয়ে জয়ন্তী পর্যন্ত যোগাযোগ স্থাপনের পথ খুলে দেয়। এই রেলপথটা উঠিয়ে দিলে বাণেশ্বর রেল পরিষেবা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হবে।’
কোচবিহারের দিনহাটার বামনহাট থেকে গিতালদহ, দিনহাটা, কোচবিহার স্টেশন, নিউ কোচবিহার, বাণেশ্বর স্টেশন হয়ে আলিপুরদুয়ার শহর স্টেশন, আলিপুরদুয়ার জংশন, রাজাভাতখাওয়া হয়ে একসময় এই পথটি জয়ন্তী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে লালুপ্রসাদ যাদব রেলমন্ত্রী থাকাকালীন রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত রেললাইন তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে বামনহাট থেকে বাণেশ্বর, রাজাভাতখাওয়া হয়ে এই পথে শিলিগুড়ি পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করে। এই অবস্থায় আলিপুরদুয়ার শহর থেকে আলিপুরদুয়ার জংশন পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার রেলপথটি তুলে দেওয়ার জন্য সেখানকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন দাবি তুলেছে। তাদের দাবি, এই রেলপথটি আলিপুরদুয়ার শহরকে দুটি ভাগ করে দিয়েছে। এই রেলপথটি তুলে দিয়ে আলিপুরদুয়ার জংশনকে নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হোক।
অ্যাসোসিয়েশন ফর বেটার কোচবিহারের সভাপতি আনন্দজ্যোতি মজুমদার বলেন, ‘মহারাজা যে সময় এই রেলপথটি তৈরি করেছিলেন, সেসময় এখানে রেলপথ তৈরি করার কথা কেউ ভাবতেও পারেননি। এখন সেই পথকে ঠুনকো দাবি নিয়ে যদি তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেটা ইতিহাসকে নষ্ট করা হবে। কলকাতার বুকে ট্রামকে তুলে দেওয়া যে ব্যাপার, এটাও সেই ব্যাপার হবে।’
বিষয়টি নিয়ে দ্য কোচবিহার রয়্যাল ফ্যামিলি সাকসেসর্স অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মুখপাত্র কুমার মৃদুলনারায়ণ মনে করেন, ‘মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুরের আমলে তৈরি এই রেলপথ অনেক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। এটাকে রক্ষা করা বা সংরক্ষণ করা আমাদের কর্তব্য। ইতিহাসকে রক্ষা করেই আমাদেরকে এগিয়ে চলতে হবে। কোনও অজুহাতে এটিকে বন্ধ করার অসৎ উদ্দেশ্যকে ধিক্কার জানাই। এটাকে বাঁচিয়ে প্রয়োজনে বিকল্প রাস্তা দেখা যেতে পারে। মহারাজার স্মৃতিবিজড়িত এই রেলপথকে আমরা কোনওভাবেই বন্ধ করতে দেব না। বিষয়টি নিয়ে খুব শীঘ্রই আমরা রেলমন্ত্রীর দ্বারস্থ হব।’
বিশিষ্ট আইনজীবী শিবেন্দ্রনাথ রায় বলছেন, ‘মহারাজার স্মৃতিবিজড়িত রেলপথটিকে উদ্দেশ্যপ্রণেদিতভাবে যারা তুলে দেওয়ার খেলায় নেমেছে তারা সুযোগসন্ধানী ছাড়া আর কিছু নয়। তাদের আসল উদ্দেশ্য রেলপথটিকে ওখান থেকে তুলে দিয়ে রেলের জমি দখল করে টাকা কামানো।’
কোচবিহারের বিভিন্ন সংগঠন মনে করছে, এই রেলপথ তুলে দেওয়া হলে নিউ কোচবিহার থেকে বাণেশ্বর হয়ে আলিপুরদুয়ার শহর পর্যন্ত যে রেলপথটি রয়েছে, সেটিরও আর কোনও গুরুত্ব থাকবে না। তাহলে এই পথটিও উঠে যাবে। এতে দিনহাটার বামনহাট বা গিতালদহ থেকে যাঁরা এখন সরাসরি কোচবিহারের বাণেশ্বর ও আলিপুরদুয়ার যাচ্ছেন, তাঁরা আর যেতে পারবেন না। বিকল্প হিসাবে গাড়িতে করে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

