আশিস ঘোষ
ভূত কি কেবল ভোটার লিস্টেই থাকে? এসআইআর-এর সুবাদে এরাজ্যে বেশকিছু ভূত ধরা পড়েছে। কেউ কেউ বাস্তবে জীবিত, কিন্তু নথিপত্রে মরে গিয়েছিলেন। তাঁরা যে দিব্যি বেঁচেবর্তে আছেন, তার প্রমাণ দিতে হয়েছে ইতিমধ্যে। কোথাও কোথাও মৃতরা আবার ভোটার লিস্টে ঠাঁই পেয়েছেন। ভাবছেন শুধু এই ভূতেরাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে? মোটেই না। আরও ভূত আছে।
এই যে ভোটে কোটি কোটি টাকা ওড়ে, সেসব জোগায় কারা? সাংবাদিকতা জীবনের গোড়ার দিকে এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরত। ‘বুর্জোয়া জমিদার’দের পার্টির কথা না হয় বাদ দিচ্ছি। কৌটো হাতে চাঁদা তোলা সর্বহারার পার্টিও খরচে তাক লাগিয়ে দিত আমাদের। সিনিয়ারদের প্রশ্ন করলে তাঁরা বলতেন, টাকা জোগায় ভূতেরা। তাদের নামধাম জানা যায় না। কাকে কত তারা দিয়েছে, জানা যায় না তাও।
সেইসব ভূতে যাতে দিনের আলোয় না বেরিয়ে পড়ে, তার জন্য আঁটোসাঁটো বন্দোবস্তের খামতি ছিল না। অতঃপর নির্বাচনি বন্ড চালু হল। ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ভোটের চাঁদা সংগ্রহে স্বচ্ছতা আনা। সুপ্রিম কোর্ট গোপন সেই ব্যবস্থা বাতিল করার পর এখন নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, বড় বড় কোম্পানি তাদের ট্রাস্টের তহবিল থেকে কত টাকা কবে কাকে দিয়েছে। পর্দার আড়ালে থাকা ভূতেরা কোন স্বার্থে এত টাকা বিলোয় বোঝা খুব কঠিন কি?
সেরকম একটা হিসেব বেরিয়েছে গত সপ্তাহে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (এডিআর) খতিয়ে দেখেছে ২০২৪-২০২৫ সালে কে কাকে কত কোটি দিয়েছে। অঙ্কটা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। ওই এক বছরে বিভিন্ন কোম্পানির নির্বাচনি ট্রাস্ট থেকে পার্টিগুলি পেয়েছে ৩,৮২৬ কোটি টাকা। ভাবতে পারেন! এই বিপুল টাকার মধ্যে সবথেকে বেশি কোন দল পাবে, তা ঠাহর করা কঠিন নয়। দিল্লিতে যাদের রাজপাট, তারাই যে বেশি পাবে, তা আলাদা করে বলতে হবে না। ওই টাকার ৮২ ভাগ একা পেয়েছে বিজেপি।
কংগ্রেস পেয়েছে ২৯৮ কোটি ৭৭ লাখ। অর্থাৎ ৭.৮১ পার্সেন্ট। তৃণমূল পেয়েছে ১০২ কোটি, মানে ২.৬৭ পার্সেন্ট। বাকি উনিশটা পার্টি মিলে পেয়েছে ২৬৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এডিআর-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, এই অগাধ দানছত্রের জোগান দিয়েছে ২২৮টা কোম্পানি। তারা দিয়েছে ৩,৬৩৬ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা। আর কোম্পানি নয়, ব্যক্তিগতভাবে ১৮৭ কোটি ৬২ লাখ দিয়েছেন ৯৯ জন।
সবথেকে বেশি টাকা দিয়েছে মুম্বইয়ের এক প্রোমোটার কোম্পানি- এলিভেটেড অ্যাভিনিউ রিয়েলিটি। তারা দিয়েছে ৫০০ কোটি। তারপরের স্থান টাটাদের, যারা দিয়েছে ৩০৮ কোটি ১৮ লাখ। টিসিএস ২১৭ কোটি ৬২ লাখ আর মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ১৭৫ কোটি দিয়েছে। রিপোর্টে ভাগ করে দেখানো হয়েছে কাদের টিকি কতটা, কোথায় বাঁধা।
ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প জোগান দিয়েছে ১,০৬৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। তারপরেই বড় বড় নির্মাণ কোম্পানিগুলি। তারা দিয়েছে ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ। আইটি, টেলিকম কোম্পানিগুলি দিয়েছে ৪৫১ কোটি ৮৬ লাখ। সবথেকে বেশি টাকা দিয়েছে মহারাষ্ট্রের কোম্পানিগুলি। তারা দিয়েছে ১,২২৫ কোটি। তারপর তেলেঙ্গানা- ৩৫৮ কোটি ২৫ লক্ষ। হরিয়ানা ২১৩ কোটি। পশ্চিমবঙ্গের কোম্পানিগুলি দিয়েছে ২০৩ কোটি এবং এই একটি ক্ষেত্রে গুজরাটকে হারিয়ে দিয়েছে বাংলা। গুজরাটের কোম্পানিগুলো দিয়েছে ২০০ কোটি।
পশ্চিমবঙ্গের কর্পোরেট দাতারা আছেন তালিকার চার নম্বরে। এরাজ্যের কোম্পানিগুলি ট্রাস্টের তহবিলে দিয়েছে ২০৩ কোটি ৮৫ লাখ। শিল্পায়নের যতই ঘাটতি থাক, এখানকার দাতাদের মধ্যে আছে ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণ শিল্প আর খনি সংস্থাগুলি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গত বছর এরাজ্যের টাকার বেশিটা পেয়েছে শাসকদল। আগের বছরের তুলনায় তাদের আমদানি বেড়েছে তিনগুণ। মোট ১৮৪ কোটি ৯৬ লাখ।
এডিআর-এর রিপোর্ট অনুযায়ী তৃণমূলকে যারা টাকা দিয়েছে তাদের মধ্যে আছে নির্বাচনি ট্রাস্ট, একটি লটারি কোম্পানি আর লোহা, খনি কোম্পানিগুলি। নেতাদের জিজ্ঞেস করলে সবার জবাব এক। যে হারে সবকিছুর দাম বেড়েছে, তাতে ভোটের খরচ বেড়েছে অনেক গুণ। তাই বড় কোম্পানির কাছে হাত না পেতে উপায় কী? দিনের শেষে প্রশ্ন একটাই, এইসব কোম্পানি কি দেশের সেবার জন্য, গণতন্ত্রকে জলহাওয়া দিয়ে পুষ্ট করতে এত দাতাকর্ণ হয়? দু’আনা দিয়ে চার আনা উশুল কি তারা করবে না?
লিস্টের ভূত তাড়াতে সবাই কোমর বেঁধে নামলেও টাকার ভূত তাড়াবে কে? বেসরকারি কোম্পানিগুলো কোনও মিশন বা সেবা প্রতিষ্ঠান নয়। কে না জানে, হয় সরকারি কাজের বরাত হাতিয়ে নয়তো আমাদের ঘাড় ভেঙে সুদে-আসলে গচ্চা টাকা উশুল করে নেবেই তারা। নইলে আবার ব্যবসা কীসের!

