গৌতম সরকার
চ্যালেঞ্জ নম্বর এক- মহাশূন্যের গেরো কাটানো। মাত্র এক আসন ভাগ্যে জুটলেও সেই চ্যালেঞ্জ রক্ষায় সফল বামেরা। আর যাই হোক, গেরো অন্তত কেটেছে। ক’দিন আগে খোদ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু জোরগলায় বলেছিলেন, শূন্য আর থাকবে না এবার। তাঁর মুখরক্ষা হয়েছে বলা যায়। কাস্তে-হাতুড়ি-তারায় ভরসা রেখেছে মুর্শিদাবাদের ডোমকল। জয়ী হয়েছেন সিপিএম প্রার্থী মহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান।


চ্যালেঞ্জ নম্বর দুই, রাম থেকে বামের ভোট স্বস্থানে ফেরানো। না, সেই চ্যালেঞ্জ রক্ষায় ব্যর্থ বামেরা। বাংলায় ভোটের হার বাড়াতে পারেনি তারা। প্রাথমিক হিসেবে ওই হার ৬ শতাংশের কাছাকাছি থেকে গেল। বরং বিজেপির জয়ে কোথাও কোথাও বামেদের কারও কারও উচ্ছ্বাসের আভাসে সেই সত্য জোরালো হয়েছে। ভোট এলে আলিমুদ্দিনের নেতারা সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক আর শেয়ারকে ইভিএমের বোতাম বলে ভুল করেন বলে ঠাট্টা চালু আছে।
যদিও কাঠফাটা রোদে ঘাম ঝরিয়ে, চটকদার গান আর স্লোগানে সোশ্যাল মিডিয়ায় কার্যত এবার তুফান তুলেছিল সিপিএমের ইয়াং ব্রিগেড। কিন্তু ইভিএম খুলতে সেই তুফান যেন বুদবুদে পরিণত হল। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, দীপ্সিতা ধর, কলতান দাশগুপ্ত কিংবা কোচবিহারের প্রণয় কার্জিদের মতো তরুণ তুর্কিদের নিয়ে সিপিএম আশার আলো জ্বাললেও বাস্তবে ফের একবার প্রমাণ হল, সংগঠন আর নীচুতলায় বুথ ম্যানেজমেন্ট না থাকলে শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার হাততালিতে ভোট বৈতরণি পার হওয়া যায় না।
উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ- সর্বত্র মেরুকরণের রাজনীতিতে ফেটে গেল বামেদের প্রচারের ফানুস। বহুচর্চিত পানিহাটি কেন্দ্রে কলতান দাশগুপ্তের ভাইরাল গান তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ঘুরলেও আরজি কর মেডিকেল কলেজে হবু ডাক্তারের ধর্ষণ-খুনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির টিকিটে জিতে গেলেন নির্যাতিতার মা। তৃণমূলের তীর্থঙ্কর ঘোষ দ্বিতীয় স্থানে, কলতান সেই তৃতীয়ই। উত্তরপাড়ায় মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের আন্তরিক জনসংযোগ নিয়ে বিরোধীদের প্রশংসা কুড়োলেও তিনি তৃতীয়। সেখানেও বিজেপির দীপাঞ্জন চক্রবর্তী প্রথম স্থানে।
দমদম উত্তরে দীপ্সিতা ধরের বাগ্মিতা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলেও তৃতীয় স্থানে তাঁর লড়াই েশষ। তৃণমূলের চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে পিছনে ফেলে জয়ী বিজেপির সৌরভ শিকদার। দমদমে ব্রাত্য বসুর মতো হেভিওয়েট তৃণমূল নেতাকে টেক্কা দিয়ে বিজেপি প্রার্থী অরিজিৎ বক্সী প্রথম স্থানে আর তৃতীয় স্থানে আটকে সিপিএমের ময়ূখ বিশ্বাস। উত্তরবঙ্গের করণদিঘিতে মহম্মদ হাজি সাহাবুদ্দিন জিতবেন বলে সিপিএমের প্রচারের ঢাক ফেঁসে গিয়েছে।
এগুলি কিছু উদাহরণ মাত্র। বামেদের জেতা দূরে থাক, দ্বিতীয় স্থানের ধােরকাছেও নেই ডোমকল বাদে কোথাও। কংগ্রেস এবার বামফ্রন্টের হাত ধরেনি। নিজের তাগদে লড়তে হয়েছে বামপন্থীদের। কোমরের জোর শক্ত করতে বামফ্রন্ট তাই আরও কিছু বাম দল ও আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। তাতে বরং বাম শরিকরা দুর্বল হয়েছে। সমঝোতা মানতে না পেরে দলের জেলা সভাপতি দীপক সরকারের নেতৃত্বে কোচবিহারে ফরওয়ার্ড ব্লকের একাংশ আলাদা প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে।
শূন্যের লজ্জা মুছলেও বামফ্রন্টের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রধান কারণ নিঃসন্দেহে দলের পুরোনো ভোটব্যাংকের পাকাপাকিভাবে গেরুয়া শিবিরে আশ্রয় নেওয়া। ফলে শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রবল হাওয়ার সম্পূর্ণ ফায়দা তুলেছে বিজেপি। সেই সুযোগ নেওয়ার জোরই ছিল না বামেদের। এমনকি বাম সমর্থক সরকারি কর্মী ও শিক্ষকদের একাংশ বিজেপি সরকার জিতলেই ডিএ মিলবে বলে আশায় ভোট দিয়েছেন।
তৃণমূলকে হারাতে সিপিএম-কে শক্তিশালী বিকল্প ভাবতেই পারেন না বামপন্থীদের অনেকে। ফলে তরুণ প্রজন্মের ঝাঁঝালো বক্তৃতা বা রাজপথের লড়াই টিভির পর্দায় ভালো লাগলেও এবং তা নিয়ে আলোচনা করলেও বুথে গিয়ে মানুষ পদ্মের বোতামে চাপ দিয়েছেন। দলের কিছু তরুণ মুখ ব্যক্তিগতভাবে জনপ্রিয় হলেও সামগ্রিকভাবে পার্টির প্রতি মানুষের অনীহা ভাঙতে তাঁরাও ব্যর্থ।
কেরলে সিপিএমের শেষ গড়ে কংগ্রেসে জোর ধাক্কা লাগার প্রেক্ষিতে বাংলায় এই ফলাফল আলিমুদ্দিনের জন্য চরম অশনিসংকেত।

