তমালিকা দে, শিলিগুড়ি : তিনি উত্তরবঙ্গের একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতা। টানা ২০ বছর শুধু রাজ্যের মন্ত্রী থাকাই নয়, অশোক ভট্টাচার্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অন্যতম প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি দলের প্রয়াত রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসেরও আস্থাভাজন ছিলেন। তাঁকে উত্তরবঙ্গের অঘোষিত মুখ্যমন্ত্রী বলা হত। এখনও যথেষ্টই কর্মঠ। কিন্তু ‘বয়স ফ্যাক্টর’-কে ব্যবহার করে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বাধীন সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব অশোককে দলে একঘরে করে রেখেছে বলে অভিযোগ। দু’দিন আগেই শিলিগুড়িতে সেলিমের এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দলে শোরগোল ছড়ায়। সিপিএমের বাংলা বাঁচাও যাত্রা-য় শিলিগুড়িতে প্রকাশ্য সভায় যোগ দিতে এসে সেলিমকে অশোকের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছুটা বিরক্তির সুরেই বলেছিলেন, ‘ওঁকেই প্রশ্ন করুন।’ রাজ্য সম্পাদকের এই মন্তব্যে অশোক যথেষ্টই মর্মাহত। ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে খবর, অশোক এনিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে নালিশ জানাবেন। বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা বলেন, ‘মেদিনীপুর থেকে ফিরেই সংবাদমাধ্যমে মহম্মদ সেলিমের মন্তব্য দেখেছি। এমনটা কাম্য নয়। বিষয়টি নিয়ে আমি পার্টির যথাস্থানে কথা বলব।’
সিপিএমের ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে রবিবার শিলিগুড়ির টিকিয়াপাড়া মাঠে প্রকাশ্য সমাবেশ ছিল। মূল বক্তা হিসেবে সেলিম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চে সেলিম ছাড়াও দলের জেলা সম্পাদক সমন পাঠক, জীবেশ সরকারের মতো নেতারা থাকলেও সেখানে অশোককে দেখা যায়নি।
বক্তব্য রাখার পরেই সেলিম সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সভায় অশোকের অনুপস্থিতি নিয়ে সেলিমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছুটা বিরক্ত হন। প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই তিনি ‘ওঁকেই প্রশ্ন করুন’ মন্তব্য করে সভাস্থল থেকে বেরিয়ে যান।
রাজ্য সম্পাদকের এহেন মন্তব্য ঘিরে দলের অন্দরে হইচই পড়ে। শিলিগুড়িতে এখনও সিপিএমের দলীয় সংগঠনের অনেকটা অংশজুড়ে অশোক ভট্টাচার্য রয়েছেন বলে দলের একটি বড় অংশ মনে করে। তাঁর উপস্থিতিতে যে কোনও মিটিং, মিছিলে ভালো ভিড় হয়। বর্ষীয়ান এই নেতা এখনও ভালোভাবে চলেফিরে বেড়ান। দলীয় সংগঠন কীভাবে চালাতে হয়, কীভাবে লোক টানতে হয় তা ভালোমতোই জানেন। গোটা রাজ্যে যখন সিপিএমের কার্যত ভরাডুবি হয়েছিল, সেই সময়ও একদিকে শিলিগুড়ির বিধায়ক এবং পরবর্তীতে মেয়র হিসাবে শিলিগুড়িতে অশোক তাঁর পুরো মেয়াদ সম্পূর্ণ করেছেন। শিলিগুড়ি মডেলের রূপকারও তিনি। এহেন একজন দাপুটে নেতাকে চক্রান্ত করেই ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে বলে দলের অন্দরেই অভিযোগ রয়েছে।
অশোক বলেন, ‘মেদিনীপুরে শনি ও রবিবারের বস্তি উন্নয়ন সমিতির রাজ্য সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। এটা রাজ্য সম্পাদক জানতেন। তার পরেও উনি এমনটা কেন বললেন বুঝলাম না।’ প্রশ্ন উঠেছে, শুধু কি রাজ্য সম্পাদকই অশোককে এড়ানোর চেষ্টা করছেন, নাকি এর পিছনে দার্জিলিং জেলা নেতৃত্বের একটা বড় অংশেরও ইন্ধন রয়েছে? কারণ, শিলিগুড়িতেও ইদানীং দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অশোক ডাক পান না। ত্রাণ সংগ্রহের সময় অশোককে সামনে রাখা হলেও বাকি কর্মসূচিগুলিতে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ করেই ছেড়ে দেওয়া হয়। দলের জেলা সম্পাদক সমন পাঠক অবশ্য বলেছেন, ‘অশোকদা আমাদের দলের বর্ষীয়ান নেতা। তাঁকে সবসময়ই গুরুত্ব দেওয়া হয়।’

