নৈতিকতা তাদের একচেটিয়া বলে আবহমানকাল দাবি ছিল বামপন্থার। যেকারণে নিজের বিশুদ্ধতা রক্ষায় বামপন্থার একধরনের ছুঁতমার্গ ছিল। ভোট এবং ভাবনা (নৈতিক) একইসঙ্গে রক্ষা ছিল লক্ষ্য। সেই অবস্থান অনেক বামমনস্ক মানুষের মানসিক ভিত্তি এখনও থাকতে পারে। বাম বলয়ের বাইরের কিছু মানুেষরও সেই বিশ্বাস আছে। কিন্তু বাম মতাদর্শের ধারক-বাহক বলে নিজেদের দাবি করা দলগুলি সার্বিকভাবে তা থেকে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে।
মহম্মদ সেলিম ও হুমায়ুন কবীরের সাম্প্রতিক বৈঠক নিয়ে সিপিএমের এক যুব নেতার মন্তব্য সেই বাস্তবকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। যুব নেতাটি দাবি করেছেন, নৈতিকতা রক্ষার দায় একা সিপিএমের নয়। তিনি না বললেও একথায় কোনও অতিশয়োক্তি নেই যে, আপাতত সেই দায় সামগ্রিকভাবে বামপন্থারও নয়। মতাদর্শের চেয়ে বেশি ভোটপ্রাপ্তি এখন বাম দলগুলির পাখির চোখ। সেই লক্ষ্য পূরণের পদক্ষেপের সঙ্গে বামপন্থার সম্পর্ক না থাকলেও কিছু যায় আসে না।
এমন নয় যে সেই ‘স্খলন’ হুমায়ুনের সঙ্গে জোট ভাবনা (ভাবনা বলাই ভালো, কার্যকর রূপ পাওয়া নিয়ে সন্দেহ আছে) দিয়ে প্রথম শুরু হল। কিংবা আব্বাস সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) সঙ্গে আসন সমঝোতা করে শুরু হয়েছিল। বিপ্লবের তাগিদে জার সাম্রাজ্যের পতন ঘটাতে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক-মেনশেভিকের জোট হয়েছিল। ভারতে বিপ্লবের পথ থেকে বাম দলগুলি অনেক আগেই সরে গিয়েছে।
ফলে বিপ্লব বা মতাদর্শ নয়, বামপন্থী দলগুলির লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু ভোটে লড়াই নয়, ভোটে জেতা। অতীতে ভোটে লড়া ছিল বামপন্থার রণকৌশল। বিপ্লব বা আলাদা চরিত্রের রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য না থাকায় ভোট মোক্ষ হয়ে ওঠায় সরকার দখল হয়ে উঠেছে বামপন্থী দলগুলির উদ্দেশ্য। সেই কারণে অতীতে জনতা পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে ১৯৭৭-এ বাংলার ক্ষমতায় আসতে কোনও ছুঁতমার্গ ছিল না।
যদিও সেই জনতা পার্টির মধ্যে জনসংঘের মতো সংঘ পরিবারের দল ছিল। ইন্দিরা গান্ধির ‘স্বৈরশাসন’কে উচ্ছেদের তাগিদ বহু মানুষের ছিল বলে তখন তাই অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানিদের সঙ্গে হাতে হাত ধরে জ্যোতি বসুর সভা করা নিয়ে বামপন্থীদের মনে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি। দোলাচল তৈরি হল বাংলা, ত্রিপুরায় বামপন্থীরা সরকারচ্যুত হওয়ার পর। কংগ্রেস একসময় ছিল ঘোষিতভাবে সিপিএমের শ্রেণিশত্রুর প্রতিনিধিত্বকারী দল।
কংগ্রেসের ‘কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগান একসময় বামপন্থীদের পরিচিত স্লোগান ছিল। সেই শত্রু শিবিরের ‘হাত’ ধরার পিছনে যে কোনও আদর্শগত অবস্থান ছিল না, তা পরিষ্কার। এখনকার প্রদেশ সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের নেতৃত্বে কংগ্রেস বেগরবাই না করলে এবং তাতে হাইকমান্ড সিলমোহর না দিলে সেই হাত ধরাধরিতে এখনও ছেদ পড়ত না। আপাতত যে বাংলার ক্ষমতা দখল অসম্ভব, তা না বোঝার মতো অজ্ঞ সিপিএম নেতৃত্ব নয়।
সংসদীয় রাজনীতি এখনকার বামপন্থী দলগুলির অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র পথ হয়ে ওঠায় সরকার দখল করতে না পারলেও যতটা সম্ভব বেশি আসনে জেতা এখন তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে। বামফ্রন্টের অন্য শরিকদের উপস্থিতি এখন স্রেফ কাগজে-কলমে। কোনও শরিকের সামান্যতম জনভিত্তি আর অবশিষ্ট নেই। তবু যতটা সম্ভব ভোট এদিক-ওদিক থেকে কুড়িয়ে নেওয়ার তাগিদে সিপিএমকে বামফ্রন্ট টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।
একা বামফ্রন্টের ক্ষমতা নেই বলে কিছু আসন জিতে অস্তিত্ব জাহিরের লক্ষ্যে তাই সিপিএম কখনও কংগ্রেস, কখনও আব্বাস, কখনও হুমায়ুনের হাত ধরতে মরিয়া। কংগ্রেসকে নিয়ে বামমনস্ক কিছু মানুষের দ্বিধা ছিল না, এমন নয়। কিন্তু হুমায়ুনের সঙ্গে জোট উদ্যোগে গেল গেল রব উঠেছে বামপন্থার ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী চরিত্রের ওপর আঘাতের সম্ভাবনায়। আদর্শের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতাও হারিয়ে গেলে বামপন্থার আর থাকে কী!

