Darjeeling | উপেক্ষিত পাহাড়ে মৌন বিদ্রোহ, বঞ্চনার কুয়াশায় ফিকে ভোটের রং

শেষ আপডেট:

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

পাহাড়ের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে দু’দিন কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু কোথাও একটা মিছিল দেখলাম না, স্লোগান শুনলাম না। শনিবার বিকেলে বাগডোগরায় যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে পদ্ম প্রতীক নেড়ে নেড়ে ভোট প্রচার করছিলেন, দার্জিলিং তখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে শীতের কামড় আরও তীব্র হচ্ছিল। তবে কোথাও ভোটের বিন্দুমাত্র আভাস নেই। পাহাড় যেন ধ্যানস্থ যোগীর মতো স্তব্ধ। কার্সিয়াং থেকে দার্জিলিং, ধূসর মেঘেদের আনাগোনায় কোথাও কোনও রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা, ব্যানার, ফেস্টুন নেই, নেই মিছিলের সেই চেনা উন্মাদনা (Darjeeling)। যে পাহাড় একসময় রাজনৈতিক আন্দোলনে গর্জে উঠত, সেখানে ভোট নিয়ে এক অদ্ভুত গুমোট আবহাওয়া। ম্যাল বা চকবাজারের ভিড়ে পর্যটকদের কোলাহল থাকলেও, স্থানীয় মানুষের মুখে রাজনীতির নামগন্ধ নেই। সমতলে জনপদ যখন ভোটের উত্তাপে ফুটছে, তখন পাহাড়ের আশ্চর্য নিস্তব্ধতা যেন দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার নীরব প্রতিবাদ।

কেন এই মৌনতা তার আভাস দিলেন প্রবীণ বাসিন্দা নিমা তামাং। সোনাদার কাছে আট মাইলে ছোট্ট হোটেল চালান নিমা। ভোটের কথা বলতে গিয়ে তাঁর আক্ষেপ, ‘গোর্খাল্যান্ডের নামে সব দলই যে ভাঁওতা দিচ্ছে সেটা মোটামুটি স্পষ্ট। পাট্টা, পর্যটনের উন্নয়ন এসব কথাও কেউ আর বিশ্বাস করে না। সবাই বারেবারে ঠকছে। তাই চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। সেকারণেই কেউ ভোট নিয়ে মাথা ঘামায় না।’ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে, ঐতিহ্যের আড়ালে ধুঁকছে এই যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাস্তবতা। কার্সিয়াং শহরের কাছেই সেন্ট মেরিজ হিলে হোমস্টে মালিক সুরজ সুব্বাও ভোটের কথায় বিরক্তি প্রকাশ করেন। ভোট তাঁর কাছে এক প্রকারের বাধ্যবাধকতা। ক্ষোভের সুর ওই তরুণের গলাতে, ‘আমরা গোর্খাল্যান্ড চাই। কিন্তু নেতাদের বিশ্বাস করি না। ভোট মানেই নেতাদের ইনকাম। তাই ভোট দেব কিন্তু কোনও মিটিং, মিছিলে আর যাব না।’

কুয়াশা সরিয়ে নীল রঙের ছোট্ট রেলগাড়িটা সোনাদা স্টেশন ছেড়ে ঘুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। মনে হল, এক টুকরো ইতিহাস জীবন্ত হয়ে সমতল থেকে শিখরে উঠে আসছে। ইউনেসকোর হেরিটেজ তকমা গায়ে সেঁটে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে আজও পর্যটকদের কাছে এক পরম বিস্ময়। কিন্তু ঝকঝকে নীল রঙের প্রলেপের নীচে যে মরচে ধরা বাস্তব লুকিয়ে আছে, নির্বাচনের মরশুমে তা যেন আরও বেশি করে প্রকট হয়ে ওঠে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পাহাড়ের গায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নিশান ওড়ে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের চাকা ব্রিটিশ আমলের খাঁজকাটা লাইনেই আটকে থাকে। দার্জিলিং শহরে নিজের অফিসে বসে ক্ষোভের সঙ্গে সেই বারোমাস্যাই শোনাচ্ছিলেন একটি হেরিটেজ ক্লাবের ম্যানেজার৷ বললেন, ‘আমরাও এক সময় ঝান্ডা নিয়ে দৌড়েছি৷ কিন্তু কলকাতার কথায় ওঠবস করা নেতাদের পকেট ভারী করার জন্য আর ঝামেলায় যাব না। গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে নীরবে কাজ করে যাব।’

পাহাড়ের ভোট মানেই এক অদ্ভুত জাদুর খেলা। সেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্রতা যেমন সত্যি, ঠিক তেমনই সত্যি রাজনীতির ঘন কুয়াশা। দার্জিলিং স্টেশনের অদূরে রেললাইনের ধারে ছোট্ট চায়ের দোকান চালান দাওয়া শেরপা। গরম মোমোর ডেকচিতে ধোঁয়া উঠতে উঠতে তিনি একগাল হেসে বলেন, ‘স্যর, এই ট্রেনের ইঞ্জিনে যেমন কয়লা লাগে, আমাদের ভোটেও তেমনি শুধু প্রতিশ্রুতির জ্বালানি দেওয়া হয়। ভোট মিটলে ধোঁয়া হয়ে সব উড়ে যায়, আমরা সেই লাইনের ধারেই পড়ে থাকি।’ দাওয়ার মতো পাহাড়ের অসংখ্য মানুষের মনের কথা এক। দশকের পর দশক ধরে ট্রেনের জানলা দিয়ে পর্যটকরা হাত নেড়েছেন, আর লাইনের ধারের পাহাড়ি তরুণরা বড় হয়েছেন বেকারত্বের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে। ভোট আসে, নেতারা আসেন, প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ভোট মিটলে সেই নীল ট্রেনটা আবার একা হয়ে যায়, পর্যটকদের ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয়ে সে কেবল এক শো-পিস হয়েই থেকে যায়। যেমনটা থেকে যায় পাহাড়ের আমজনতা।

বাতাসিয়া লুপে যখন টয়ট্রেন একটা বৃত্ত সম্পন্ন করে, তখন মনে হয়, পাহাড়ের রাজনীতিও যেন এক লুপের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই একই দাবি, সেই একই বঞ্চনার ইতিহাস আর সেই একই রঙিন প্রতিশ্রুতি। পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি প্রেমা ভুটিয়া এসব দেখতে দেখতে বিরক্ত। ম্যালে দাঁড়িয়ে গল্পের মাঝে জানালেন তাঁদের কর্মসংস্থানের সমস্যার কথা, সেই সমস্যা নিয়ে নেতাদের মাথাব্যথা না থাকার যন্ত্রণার কথা। ভোটে না মেতে পাহাড়ের বাসিন্দারা নিজেদের কাজে মন দেওয়ায় খুশি প্রেমা৷

তাঁদের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আঁচ পেয়েছেন পাহাড়ের নেতারাও। তাই তাঁরা সতর্কে পা ফেলছেন। গোর্খাল্যান্ড আদায় করতে না পারার ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা বিমল গুরুং। তাঁর কথা, ‘আমাদের আবেগ নিয়ে অনেক দল খেলা করেছে। সাধারণ মানুষের রাগ হওয়াটা যথার্থ। তাঁদের ভাবনাকে সম্মান দিয়েই আমরা ভোটের প্রচার করছি।’ ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার নেতা অনীত থাপার দাবি, পাহাড়বাসী উন্নয়নের নিরিখে ভোট কাকে দিতে হবে সেটা নাকি ঠিক করে ফেলেছেন। তাই ঝান্ডা লাগিয়ে লোকদেখানো প্রচারের বদলে ছোট ছোট খুলি বৈঠককেই তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। অবশ্য অন্য কথা শুনিয়েছেন ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা অজয় এডওয়ার্ড। পাহাড়ের মানুষজন যেসব অভিযোগ করছেন তার প্রত্যেকটি ঠিক বলেই মনে করেন অজয়। তাঁর কথা, ‘ঝান্ডা ঝুলিয়ে নয়, কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে যেভাবে প্রচার করার সেটাই করছি।’

দার্জিলিংয়ের রাজনীতি যে ধীরে ধীরে রূপ বদলাচ্ছে পাহাড়ে ঘুরলে তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। নেতারা যখন ছোট ছোট বৈঠকে জয়ের সমীকরণ মেলাচ্ছেন, পাহাড় তখন নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছে- রকমারি বোর্ড বানিয়ে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে বা উন্নয়নের ধুয়ো তুলে আর পাহাড়ের মানুষের মন জেতা সহজ হবে না।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

IPL | দিল্লির কাছে হার পঞ্জাবের, টানা ৪ ম্যাচে পরাজয় শ্রেয়সদের

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ আইপিএলের (IPL) গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বড়...

Chopra | নেপালে পালানোর ছক? সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার চোপড়ার দাপুটে তৃণমূল নেতা গোপাল ভৌমিক!

মনসুর আলম, চোপড়া: উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া রাজনীতিতে বড়সড় চমক।...

Abhishek Banerjee | আর ‘প্রভাব প্রদর্শন’ নয়! অভিষেকের ‘জেড প্লাস’ নিরাপত্তা কাড়ল রাজ্য

উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ রাজ্যের প্রশাসনিক চিত্রপটে আমূল পরিবর্তনের...

Anganwadi Center Protest | অঙ্গনওয়াড়িতে ডিম অমিল! বালুরঘাটের করিমগুটিনে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন অভিভাবকরা

পতিরাম: শিশুদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার সরকারি নির্দেশ থাকলেও,...