শ্রীখোল ছাপিয়ে ডিজে কীর্তনের দাপট

শেষ আপডেট:

মলয় চক্রবর্তী

বাঙালির মজ্জায় মিশে থাকা যে কীর্তনের সুর একদিন শ্রীচৈতন্যদেবের হাত ধরে বড়সড়ো সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বদল এনেছিল, আজ তা এক বিকৃত সংস্কৃতির নির্মম শিকার। ভক্তি প্রেম আর সমর্পণের যে সুমহান ঐতিহ্য বাঙালিকে গোটা বিশ্বদরবারে চিরকাল সম্মানিত করেছে তা আজ ডিজে কীর্তনের নামে সস্তা চটুলতায় পর্যবসিত। সম্প্রতি বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে এবং ইউটিউবের ভাইরাল ভিডিওগুলোতে নিয়মিত যা দেখা যাচ্ছে তা কীর্তনের মূল ভাবনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আধ্যাত্মিকতার নামে সেখানে যা পরিবেশন করা হচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রেই আইটেম গানের চটুলতাকেও অনায়াসেই হার মানায় বলে মনে করা হচ্ছে।

কীর্তনের মূল নির্যাস হল নামসংকীর্তন, যেখানে ভক্ত নিজেকে ঈশ্বরের চরণে সম্পূর্ণ বিলীন করেন। কিন্তু বর্তমানের এই ডিজে সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখা যায় কীর্তনের পবিত্র আসরে চটুল ফিল্মি গানের তর্জমায় উদ্দাম নাচগান চলছে। কানে তালা লাগানো ডিজে বক্সের বিকট আওয়াজে শ্রীখোল আর করতালির সেই পবিত্র ঝংকার আজ প্রায় মৃতপ্রায়। যে আঙিনায় একসময় বৈষ্ণব পদাবলির সুগভীর দর্শনে মানুষ আত্মহারা হতেন আজ সেখানে লেজার লাইটের ঝলকানিতে প্রবলভাবে চলছে সস্তা বিনোদনের আসর। আধ্যাত্মিকতার মোড়কে ঘটা এই পরিবর্তন আসলে সাংস্কৃতিক রুচির চরম অবক্ষয়কেই চোখের সামনে তুলে ধরে।

এই গভীর সংকটের মূলে লুকিয়ে রয়েছে সস্তা জনপ্রিয়তা আর বাণিজ্যিক লাভের প্রবল হাতছানি। কিছু অসাধু আয়োজক আর ভিউ বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামা ইউটিউবারদের পাল্লায় পড়ে কীর্তনের মতো এক সুগভীর দর্শন আজ অনেকটাই তার নিজস্ব গাম্ভীর্য হারাচ্ছে। যে মানুষগুলো এই ডিজে কীর্তনের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা হয়তো ভুলেই গেছেন যে কীর্তন হল অন্তরের মুক্তির সোপান, কোনও আধুনিক ডিস্কোথেকের অস্থায়ী মঞ্চ নয়। কীর্তনের আসরে আধুনিক পোশাকের আড়ালে যে কদর্য শারীরিক কসরত প্রকাশ্যে দেখানো হচ্ছে তা কেবল মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকেই আঘাত করে না বরং সুস্থ সমাজ ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মূলেও আঘাত হানে।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এখনও পর্যন্ত আমাদের সচেতন সমাজ এবং বুদ্ধিজীবী মহলের একটা বড় অংশ এই স্পর্শকাতর বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চুপ। কিন্তু তাঁদের মনে রাখা প্রয়োজন, শিকড় ছিঁড়ে গেলে কোনও গাছ যেমন বাঁচতে পারে না তেমনি নিজস্ব ঐতিহ্যকে পণ্যে রূপান্তরিত করে কোনও জাতিও দীর্ঘকাল সগৌরবে টিকে থাকতে পারে না। জয়দেব, বিদ্যাপতি কিংবা চণ্ডীদাসের সেই অমর সৃষ্টিগুলোকে যাঁরা আজ অন্ধভাবে ডিজের তালে ধুলোয় মেশাচ্ছেন তাঁদের বিরুদ্ধে এবার সংঘবদ্ধভাবে কথা বলার সময় এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সচেতন বাঙালি সমাজ এখনই এই অপসংস্কৃতির পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ালে অদূরভবিষ্যতে বাঙালির নিজস্ব সম্পদ বলতে হয়তো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

আধ্যাত্মিকতার নামে এই চরম চটুলতার কারবার অবিলম্বে একেবারে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কীর্তন কোনও সস্তা বিনোদন নয়, এটি পবিত্র একটি জীবন্ত সাধনা। এই সাধনাকে যাঁরা নির্লজ্জভাবে বাণিজ্যিক পণ্যের মোড়কে জনসমক্ষে আনছেন তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত জনমত গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বিদগ্ধ সমাজ সকলের কাছেই আজ এই গভীর প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি এভাবেই আমাদের প্রাচীন শিকড়কে হারিয়ে যেতে দেব? আজ আমরা নীরব থাকলে আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য কেবল একটি বিকৃত উপহাসে পরিণত হবে।

(লেখক প্রাবন্ধিক)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উন্নয়নের নতুন ভোরে বাংলা

হরদীপ সিং পুরী হাওড়াকে একসময় বলা হত এশিয়ার শেফিল্ড। হুগল...

অভিষেকের ঘাড়েই হারের দায়

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দান আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বোর্ডের মিটিং যে...

বাংলার রাজনীতিতে এক নয়া অধ্যায়

সাত দশকের চেনা রাজনৈতিক ব্যাকরণ বদলে রাজ্যের মসনদে এবার...

পূর্ণ বৃত্ত পেল এক দীর্ঘ ইতিহাস

নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে ব্রিগেডের মঞ্চ, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও...