যে কায়দায় দিল্লি পুলিশ বঙ্গ ভবনে কয়েকজন বাঙালিকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করল, তা বাংলায় আকছার হয়ে থাকে। দিনকয়েক আগে আশাকর্মীদের স্বাস্থ্য ভবন অভিযান আটকাতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তৎপরতা প্রায় একইরকম ছিল। শুধু পথে নয়, আশাকর্মীরা যাতে বাড়ি থেকে বের হতে না পারেন, তার জন্য পুলিশকে মরিয়া হতে দেখা গিয়েছে। এর আগে চাকরি কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে শিক্ষক ও বঞ্চিত কর্মপ্রার্থীদের বিক্ষোভ আটকাতে একই পদ্ধতি দেখা গিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সেই তৎপরতা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রসম্মত ছিল না। গণতান্ত্রিক দেশে বাকস্বাধীনতার পাশাপাশি যে কারও ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত স্তরে আন্দোলন ও প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। নয়াদিল্লি গিয়ে বাংলার জনাকয়েক বাসিন্দারও প্রতিবাদ জানানোর পরিকল্পনা আছে। তাঁদের আপত্তি মূলত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে। নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় প্রচুর জীবিত মানুষকে মৃত দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এছাড়া শুনানিকে কেন্দ্র করে বাংলায় অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। মূলত এই দুটি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বাংলার ওই বাসিন্দারা নয়াদিল্লি গিয়েছেন। কমিশনের সদর দপ্তরে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁদের যন্তরমন্তরে ধর্নায় বসার কর্মসূচি আছে। যদিও তাঁদের এই নয়াদিল্লি যাত্রা পুরোপুরি তৃণমূলের ব্যবস্থাপনায়। তাতে যোগ রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের। যে কারণে রাজ্য সরকারের অতিথিশালা বঙ্গ ভবনে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কোনও কর্মসূচি করার আগেই দিল্লি পুলিশ ওই লোকগুলির গতিবিধি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যা ভাইরাল বেশ কয়েকটি ভিডিওতে ধরা পড়েছে। কয়েকজনের পরিচিতিপত্র দিল্লি পুলিশ নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া, বঙ্গ ভবনের ঘরে ঘরে ঢুকে দিল্লি পুলিশ বাংলা থেকে যাওয়া ওই মানুষগুলিকে নানাভাবে হেনস্তা করেছে বলে সোচ্চার হয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মুখ্যমন্ত্রীর ওই কার্যকলাপ যে নিজের দলীয় উদ্দেশ্য সাধনে, তা নিয়ে সংশয় নেই। কিন্তু দিল্লি পুলিশ যা করল, তা সাধারণ মানুষকে সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার নামান্তর। গণতন্ত্রে এমন কার্যকলাপ পুলিশ রাষ্ট্রের আশঙ্কা জাগায়। দিল্লি পুলিশ সরাসরি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন। যে দপ্তরের মন্ত্রী অমিত শা। ফলে তাঁর অগোচরে দিল্লি পুলিশ অতিসক্রিয় হয়েছে বললে সত্যের অপলাপ করা হবে।
সেই ঘটনা যেমন নিন্দার যোগ্য, তেমন রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পুলিশের আন্দোলন দমনে কড়া পদক্ষেপ একইভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। তা সে কলকাতার আরজি কর মেডিকেলে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনের প্রতিবাদ হোক কিংবা রুজিরুটির দাবিতে আন্দোলন হোক। নয়াদিল্লিতে যখন সেখানকার পুলিশের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পথে নেমে প্রতিবাদ করছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, তখন তাঁর সরকারের কার্যকলাপকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে হাইকোর্ট। বিরোধী দল ও নেতাদের কর্মসূচির নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের বলে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে।
নানা অজুহাতে কিংবা নিরাপত্তামূলক আইন কার্যকর করে প্রায়ই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কর্মসূচি আটকে দেয় বাংলার পুলিশ। এপর্যন্ত ১৫০-রও বেশি ঘটনায় হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে সেইসব কর্মসূচি পালন করতে হয়েছে শুভেন্দুকে। আবার দিনকয়েক আগে মালদায় সিপিএমকে সভা করার অনুমতি দেয়নি পুলিশ। পরে সিপিএম রাস্তা দখল করে সভা করায় ব্যাপক যানজট হয়।
যে ভোগান্তির দায় কিন্তু ওই বিরোধীদের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাবের পরিচয় দেওয়া পুলিশের। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধীদের মর্যাদা ও গুরুত্ব অনেক। যা সংবিধান স্বীকৃত। যে কারণে লোকসভা হোক বা বিধানসভা- যে কোনও আইনসভা আসলে বিরোধীদের বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সেকথা সংবিধানে লেখা থাকলেও কেন্দ্র বা রাজ্য, কেউই তা পালনে সচেষ্ট নয়। গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণে কেন্দ্র ও বাংলার সরকার একই নৌকায় চড়ে চলেছে, তা আবার প্রমাণ হল।



