রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: চিকিৎসক অভীক দে, বীরূপাক্ষ বিশ্বাস সাসপেন্ড হয়েছেন। সিবিআইয়ের আতশকাচের নীচে ডাঃ সুদীপ্ত রায় এবং ডাঃ সুশান্ত রায়। চাপের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ডাঃ সুহৃতা পালও। এরই মাঝে অপসারিত হয়েছেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা ডাঃ কৌস্তভ নায়েক এবং স্বাস্থ্য অধিকর্তা ডাঃ দেবাশিস হালদার। গত এক মাসে এভাবেই ‘উত্তরবঙ্গ লবি’ একটু একটু করে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। বাকি রয়েছে শুধু পশ্চিমবঙ্গ মেডিকেল কাউন্সিল। এই কাউন্সিলও ভেঙে ফেলার দাবিতে সরব হয়েছেন চিকিৎসকরা। তাঁরা বলছেন, এই কাউন্সিল ভেঙে ফেলার মতো ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাতে দেওয়া রয়েছে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের সম্পাদক ডাঃ কৌশিক চাকি বলছেন, ‘রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল হচ্ছে সমস্ত দুর্নীতির আঁতুড়। সেখানকার সিংহভাগ নির্বাচিত সদস্যই উত্তরবঙ্গ লবির। আর কীভাবে নির্বাচন হয়েছে সেটা কারও অজানা নয়। আমরা চাই, রাজ্য ক্ষমতা প্রয়োগ করে ওই কাউন্সিল ভেঙে দিক।’


গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে রাজ্যের স্বাস্থ্যক্ষেত্রের দখল নিয়েছিল ‘উত্তরবঙ্গ লবি’। ২০২০ সালের করোনা অতিমারি এই লবির কাছে শাপে বর হয়েছিল। কেননা সেই সময় উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির এক চিকিৎসক আচমকাই স্বাস্থ্য দপ্তরের উত্তরবঙ্গের একটি বিশেষ দায়িত্ব পান। ব্যাস সেই থেকে আরও জাল বিস্তার করে ‘উত্তরবঙ্গ লবি’। স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে কোনওভাবে জড়িত না থাকলেও কলকাতার এক প্রবীণ চিকিত্সকের সঙ্গে শাসকদলের বেশ দহরম-মহরম রয়েছে। সেই চিকিৎসককে সামনে রেখে এই লবি রাজ্য সরকারের শীর্ষস্থানীয়দের আশীর্বাদ পেতে শুরু করে। কলকাতার প্রবীণ ওই চিকিৎসকও উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র হওয়ায় তাঁর সঙ্গে জলপাইগুড়ির চিকিৎসকের সুসম্পর্ক আগে থেকেই ছিল। এই দুজন মিলেই উত্তরবঙ্গ লবির বীজ বপন করেন। পরে ধীরে ধীরে অভীক, বীরূপাক্ষ, সুদীপ্ত, সুহৃতা সহ অন্যরা এই গোষ্ঠীতে নাম লেখান।
আরজি কর কাণ্ডের পর রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষায় দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগের পাহাড় সামনে আসছে। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় এজেন্সি সিবিআই এবং ইডি এই ঘটনার তদন্ত করছে।
উত্তরবঙ্গ লবির অন্যতম দুই তরুণ ‘খেলোয়াড়’ অভীক এবং বীরূপাক্ষকে স্বাস্থ্য দপ্তর সাসপেন্ড করেছে। দুজনের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। আরজি কর মেডিকেল থেকে সন্দীপ ঘোষকে সরিয়ে উত্তরবঙ্গ লবির আর এক কর্তা সুহৃতা পালকে অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়েছিল স্বাস্থ্য ভবন। কিন্তু আরজি করের আন্দোলনকারীরা সুহৃতাকে হাসপাতালে ঢুকতেই দেননি। বাধ্য হয়ে সুহৃতাকে সেখান থেকে সরিয়ে বারাসাত মেডিকেল কলেজের দায়িত্ব দিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন। উত্তরবঙ্গ লবির আর এক কর্তা সুদীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধেও প্রচুর অভিযোগ উঠছে। পরপর দু’দিন ইডি সুদীপ্তর বাড়ি এবং নার্সিংহোমে হানা দিয়েছে। ইডি স্ক্যানারে রয়েছেন এই লবির জলপাইগুড়ির এক চিকিৎসক নেতাও। রাজ্যের স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তা পদের জন্য ইন্টারভিউ নেওয়া হলেও প্রথম দিকের বেশ কয়েকজন সিনিয়ারকে ছাপিয়ে এই লবির অঙ্গুলিহেলনেই কৌস্তভ নায়েককে ওই পদে বসানো হয়েছিল। একইভাবে স্বাস্থ্য অধিকর্তা পদেও বসেছিলেন দেবাশিস হালদার। দুজনকেই মঙ্গলবার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল পুরোপুরি উত্তরবঙ্গ লবির দখলে। এবার এই কাউন্সিল ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলছেন চিকিৎসকরা। অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিসেস ডক্টরস-এর রাজ্য সম্পাদক ডাঃ মানস গুমটা বলছেন, ‘স্বাস্থ্য শিক্ষায় দুর্নীতি, থ্রেট কালচারে জড়িত সবক’টা লোকই ওই মেডিকেল কাউন্সিলে রয়েছে। এটাকে ভাঙতেই হবে।’

