হে নূতন দেখা দিল আলোক-লগনে

শেষ আপডেট:

বাংলাদেশে বাঙালির নববর্ষ বহু অমৃতের সন্ধান দিল। মৌলবাদীদের সক্রিয়তার মাঝেও মিশে গেলেন রবীন্দ্রনাথ থেকে ভীষ্মদেব।

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

মুখ চোখ দেখে মনে হচ্ছিল বয়স যেন অনেক কমে গিয়েছে। বহুদিন পর তাঁকে দেখে পুরোনো দিনের রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে মনে পড়ছিল, যখন তিনি কলকাতার এক চ্যানেলে রবীন্দ্রসংগীত শেখানোর অনুষ্ঠান করতেন নিয়মিত। একেবারে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সুলভ মধুর গলা, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সুলভ অশেষ প্রশান্তি মুখে লেগে।

আজকের রেজওয়ানাকে ঘিরে তখন হাজারখানেক ছাত্রছাত্রী। সবার মুখে রবীন্দ্রগান। ঢাকা ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে গান শুরু করেছেন রেজওয়ানা। সেই রবীন্দ্রধ্বনি মহাসংগীতের মতো ছড়িয়ে পড়ছে অন্যদের গলায়, ধীরে ধীরে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন প্রান্তে। দৃশ্যটা সত্যি সত্যি ঐশ্বরিক দেখাচ্ছিল পয়লা বৈশাখের সকালে।

হাসিনা বিদায়ের পর রেজওয়ানার মতো বিশিষ্ট সংগীত ব্যক্তিত্বকে প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। শোনা তো দূরে থাক। মাসকয়েক আগে তিনি প্রায় অজান্তেই কলকাতায় ছিলেন তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে। হাসিনা তাঁকে পছন্দ করতেন বলে ইউনূস জমানায় তিনি ব্রাত্য হয়ে উঠেছিলেন।

ইউনূসদের পুতুল করে ওই সময় মৌলবাদী জামায়াতে এবং ছাত্রদের একটি অংশ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বিদ্রোহ করেছিল। রবীন্দ্রসংগীত গাওয়াই হয়ে উঠেছিল অসম্ভব কাজ। প্রশাসনের প্রশ্রয় পেয়ে এরা বলতে শুরু করেছিল, রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সংগীত করা চলবে না। ওই হিংস্রতা ও অন্ধকারের বন্যায় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা কোথায় গাইবেন গান? সনজিদা খাতুন, মিতা হক, পাপিয়া সারোয়ারের মতো প্রয়াত গায়িকারা একদিক দিয়ে ভাগ্যবতী। তাঁদের বাংলাদেশে এ হেন চরম রবীন্দ্রলাঞ্ছনা দেখতে হয়নি!

হাসিনা দিল্লি পালিয়ে আসার পর ঢাকার সংস্কৃতি জগতের প্রচুর মুখকে আর দেখাই যাচ্ছিল না। কেনই বা দেখা যাবে? তাঁদের অশ্লীল গালাগালি দেওয়া হচ্ছিল। এবং গালাগালির একটাই কারণ, তাঁরা হাসিনার খুব কাছের ছিলেন। হাসিনা তাঁদের গান ভালোবাসতেন, অভিনয় ভালোবাসতেন। এটাই ছিল তাঁদের একমাত্র অপরাধ। রবীন্দ্রসংগীতের আর এক পরিচিত নাম লিলি ইসলাম। তাঁর স্বামী চয়ন ইসলাম আওয়ামী লিগের দু’বারের সাংসদ ছিলেন, শুধু এই অপরাধে নিজেকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখতে হয়েছিল। হায় রে বঙ্গ সংস্কৃতি! একই দশা ছিল চঞ্চল চৌধুরী সহ অনেক অভিনেতার। গান, অভিনয় সব তখন কার্যত বন্ধ।

বিএনপি সরকারকে কৃতিত্ব দিতে হবে, তারা অধিকাংশ শিল্পীকে আবার আলোয় আসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে নববর্ষে। বছরের প্রথম দিন ঢাকায় কোনও প্রতিশোধস্পৃহা কাজ করেনি, যা জামায়াতে ক্ষমতায় এলে সম্ভব ছিল না এবং তাদের সহযোগী ছাত্রদল ক্ষমতায় থাকলেও অসম্ভব ছিল।

তরুণ প্রজন্মের অনেক বেশি নমনীয়তা এবং ক্ষমাশীলতা থাকা দরকার, কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র পার্টি এনসিপিতে তা নেই। তারা আজও পড়ে আছে একেবারে পুরোনো আমলে। একমাত্র সে কারণেই নেপালে যা সম্ভব হয়েছে, তা বাংলাদেশে সম্ভব হয়নি। জনতা এই নব্য প্রজন্মের উচ্চকিত হিংস্র ছাত্রদলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেখলাম, তাদেরও কিছু নেতা পয়লা বৈশাখে (ওঁরা বলেন পহেলা বৈশাখ, যা একশো বছর আগে বাঙালি বলত) মিছিলে নাচানাচি করেছেন। বুঝেছেন হয়তো, বাংলা নববর্ষকে অবজ্ঞা করা যাবে না।

নির্বাচনে ওরা জনতার হাতে প্রত্যাখ্যাত বলেই আমরা পয়লা বৈশাখে বাংলাদেশের সেই চিরন্তন রূপ দেখতে পেয়েছি ঢাকায়, যেখানে রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি সলিল চৌধুরীর গানও গেয়ে ওঠে হাজার কয়েক মানুষ। বাংলাদেশের এই অনুষ্ঠানকে পশ্চিমবঙ্গবাসীর অনেকেই ঈর্ষা করেন। কেননা বাংলা প্রথম মাসের পয়লা তারিখকে এত রাজকীয়ভাবে আমরা কেউ উদযাপন করতে পারিনি। পারবও না কোনওদিন।

ইউনূসের জমানায় যে ছায়ানটের দপ্তরে গিয়ে হারমোনিয়াম, তবলা-ডুগি, সেতার, সারেঙ্গি ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল, সেই সংস্থার ছাত্রছাত্রীরা আবার রাস্তায় নেমে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী গান গাইছে— এর থেকে ভালো দিক আর কী হতে পারে?

পয়লা বৈশাখে রমনা বটমূলে দর্শনার্থীদের বেশির ভাগের পরনে তখন শাড়ি আর পাঞ্জাবি। শিশু-কিশোরী ও নারীরা পরেছেন লাল-সাদা শাড়ি। ছেলেদের পাঞ্জাবিতে ছিল লাল–সাদার ছোঁয়া। ছায়ানটের উদ্যোগে প্রথম গানটি কী হল সকাল সওয়া ছ’টার সময়? শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। এপার বাংলার অধিকাংশ সংগীত সংস্থার প্রধানরা ভাবতেও পারবেন না। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের স্মরণীয় গান— ‘জাগো আলোক-লগনে’।

শুধু এই দুটো-তিনটে ছবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ আবার সঠিক পথে হাঁটার চেষ্টায়! কতটা হাঁটতে পারবে আমি নিশ্চিত নই। কেননা অনেক বন্ধুবান্ধবকে দেখি, আজও সহজ সত্যি কথা লিখতে ঘাবড়ে যাচ্ছে। সব সময় ভয় মৌলবাদ আবার তাদের পেছনে খাঁড়া নিয়ে নামবে। সেই ভয়টাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশের দুর্গতির সময় বিদেশ থেকে যে সমস্ত অকর্মণ্য চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক ইউটিউবার বাংলাদেশের সম্প্রীতি ভেঙে ফেলার কাজ করত, সেই পিনাকী ভট্টাচার্য, ইলিয়াসরা এখনও সমানভাবে সক্রিয়। কেন এদের গ্রেপ্তার করার জন্য ইন্টারপোলকে বাংলাদেশ সরকার বলছে না, এটাই একটা প্রশ্ন।

বিদেশে বসে বাংলাদেশে অশান্তি ছড়ানোর লোক প্রচুর। প্রথম নামই পিনাকী ভট্টাচার্য। সে বাংলাদেশের নারীদের ১০০ বছর পেছনে ফেলে দেওয়ার চেষ্টায়। সেখানে দেখে ভালো লাগল পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জায়গায় নারীরা গাইছেন প্রাণ খুলে। গাইছেন রবীন্দ্রনাথ, গাইছেন নজরুল, গাইছেন দ্বিজেন্দ্রলাল, গাইছেন লালন, গাইছেন সলিল। সেদিন ছায়ানটের অনুষ্ঠানে যেমন শোনা গিয়েছে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা ‘এসো মুক্ত করো’, সলিল চৌধুরীর ‘সেদিন আর কত দূরে’।

সেদিন আর কত দূরে যেদিন পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে প্রাণের বাংলাদেশ! যেখানে সাকিব-তামিম ইকবালরা আবার ক্রিকেট মাঠে নিজস্ব জ্যোৎস্না ছড়াবেন চিরাচরিত ঢংয়ে।

ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী নববর্ষের দিন তাঁর ভাষণে বলেছেন, অপশক্তি আবহমান বাংলা গানকে তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে শিকড় বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত। তাঁর পরবর্তী মন্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ— সবাই যেন নির্ভয়ে গান গাইতে পারে। যেন সংস্কৃতির সব প্রকাশ নির্বিঘ্ন হয়। বাঙালি যেন শঙ্কামুক্ত জীবনযাপন করে।

শুনতে শুনতে লিখতে লিখতে কোথাও যেন মনে হয়, এই বাংলাতেও তো মাঝে মাঝেই একই অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচন পূর্ব বাংলাদেশে সুফি গায়ক-বাউল-বয়াতিদের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝেই ভয়াবহ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। গানকে কেন্দ্র করে খুনোখুনির আয়োজন রীতিমতো অকল্পনীয়। এই মানুষগুলো বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানুষের জন্য পংক্তিমালা তৈরি করলেন, তাঁরাই এখন উগ্রবাদীদের গ্রাসে পরিণত।

বাংলাদেশি বন্ধুদের কাছে শুনলাম, গ্রামীণ অর্থনীতি দখলের লড়াই রয়েছে বাউল বিরোধিতার পিছনে। অতীতে শীতকালে বাউল-ওরস-জলসা-যাত্রা ছিল গ্রামীণ মানুষের উৎসবের অঙ্গ। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে ওয়াজ মাহফিলও এই তালিকায় জায়গা করে নেয়। মতাদর্শগত কারণেই অতি উগ্র ওয়াজ মাহফিল বাকি সবক’টি সাংস্কৃতিক ধারার বিরোধী। তারাই পুরো অর্থের দখল নিতে চায়। সেইজন্যই হয় বাউলদের ওপর হামলা।
বাংলা নববর্ষের আগের রাতে সিলেটের শ্রীপুর গ্রামে এই রকমই হামলা চলেছে। হামলাকারীরা স্লোগান দিতে দিতে লাঠিসোঁটা হাতে মঞ্চে এসে এলোপাতাড়ি ভাঙচুর চালায়। তারা মঞ্চে থাকা বাদ্যযন্ত্র, সাউন্ড সিস্টেম ও দর্শনার্থীদের বসার চেয়ার ভেঙে ফেলে। আকস্মিক হামলায় আতঙ্কিত হয়ে আয়োজক ও মাজার ভক্তরা অনুষ্ঠানস্থল থেকে পালিয়ে যান। এতে পুরো অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। ভাঙচুরকারীরা মিছিল করে বেরিয়ে যায়।

আমাদের এখানে বাংলাদেশি গায়ক-গায়িকাদের মধ্যে যাঁরা অতি পরিচিত, তাঁদের মধ্যে একমাত্র অদিতি মহসিনই হাসিনা পরবর্তী জুলাই বিপ্লবে ছাত্রদের পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী অদিতি ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘ব্রেভো মাই বয়েজ অ্যান্ড গার্লস, উই আর উইথ ইউ।’ তিনি ইউনূসকে সমর্থন করেছিলেন। এমনও লিখেছিলেন, ‘১৭ দিন বয়সের সরকারের কাছে এত দাবিদাওয়া কেন?’

যেদিন থেকে ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সংগীত নিষিদ্ধ করার দাবি উঠল এবং রবীন্দ্রনাথকে গালাগাল বাড়তে থাকল, সেদিন থেকে দেখলাম অদিতি মত পালটাতে শুরু করলেন। উলটো দিকে সাহসিনী। একবার ‘সোনার বাংলা’ গান পোস্ট করে তিনি লিখলেন, ‘কে কী বলল, সেটা নিয়ে কি আমরা একটু বেশি পাত্তা দিয়ে ফেলছি!’ শারদ শুভেচ্ছা জানালেন সবাইকে। আওয়ামী লিগ নেত্রী মতিয়া চৌধুরীর প্রয়াণে তাঁর ছবি দিয়ে অদিতি শ্রদ্ধার্ঘ্য পোস্ট করলেন এমন সময়ে, যখন এইসব করতে সবাই ভয় পেত।

এভাবেই বাংলাদেশে ধীরে ধীরে অনেকে পালটাচ্ছেন। অনেক কিছু পালটাচ্ছে। জামায়াতের রমরমার দুশ্চিন্তার মধ্যে বাঙালির নববর্ষ বাংলাদেশে অনেক অমৃতের ইঙ্গিত, অসাম্প্রদায়িকতার ইঙ্গিত দিয়ে গেল! ওই তো ভীষ্মদেবের গান হচ্ছে সমবেত কণ্ঠে— জাগো আলোক-লগনে!

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উন্নয়নের নতুন ভোরে বাংলা

হরদীপ সিং পুরী হাওড়াকে একসময় বলা হত এশিয়ার শেফিল্ড। হুগল...

অভিষেকের ঘাড়েই হারের দায়

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায় রাজনীতির ময়দান আর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বোর্ডের মিটিং যে...

বাংলার রাজনীতিতে এক নয়া অধ্যায়

সাত দশকের চেনা রাজনৈতিক ব্যাকরণ বদলে রাজ্যের মসনদে এবার...

পূর্ণ বৃত্ত পেল এক দীর্ঘ ইতিহাস

নন্দীগ্রামের লড়াই থেকে ব্রিগেডের মঞ্চ, এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও...