প্রতিটি বিধানসভা এলাকা একেকটি জীবন্ত জনপদ। তার নিজস্ব রসায়ন আছে। একেক বিধানসভায় রাজনীতির বোঝাপড়া একেকরকম। ভোটের আগে প্রতিটি বিধানসভার সেইসব গোপন রাজনৈতিক রসায়নের কথা তুলে ধরছে উত্তরবঙ্গ সংবাদ। আজ নজরে ধূপগুড়ি
সপ্তর্ষি সরকার ও পূর্ণেন্দু সরকার, ধূপগুড়ি: ধূপগুড়ি হাসপাতালের (Dhupguri Hospital Project) আশপাশে ইদানীং দিনরাত ভারী যন্ত্রপাতির আওয়াজ মেলে। তিরিশ কোটি টাকা খরচে ছয়তলা ঢাউস মাপের সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ার কাজ চলছে যে। হাসপাতালের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে সেদিকে ইশারা করে ওষুধের দোকানদারকে এক ক্রেতা বললেন, ‘তোমাদের তো গুটি লাল।’ দোকানি সহাস্য জবাব দেন, ‘তোমাদের বোলো না, বলো আমাদের সবার। হাসপাতাল হলে ধূপগুড়ির (Dhupguri Election Ground Report) সবথেকে বড় সমস্যার সমাধান হবে।’
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ক্রেতা পালটা বলেন, ‘ভাগ্যিস মহকুমাটা হয়েছিল। তা না হলে কি হাসপাতালের এই উন্নয়ন হত?’ প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপদ রায়ের মৃত্যুর পর ২০২৩-এ বিধানসভার উপনির্বাচনে তৃণমূলের সবথেকে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল সময় বেঁধে মহকুমা ঘোষণা। তার সুফল মিলেছিল। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও ৪৩০৯ ভোটে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল।
ধূপগুড়ি (Dhupguri) শহরে অবশ্য ৯৪১ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। ছয়তলা হাসপাতাল যেখানে গড়ে উঠছে, শহরের সেই ৮ নম্বর ওয়ার্ডে সবথেকে বেশি ব্যবধানে ছিল বিজেপির সঙ্গে। পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, ২০০৭ থেকেই এই হাসপাতাল বিজেপির দুর্ভেদ্য দুর্গ। উপনির্বাচনে তৃণমূল জেতার পর শুধু ধূপগুড়ি হাসপাতালের ভোল বদল নয়, বানারহাটে তিরিশ কোটি টাকায় গ্রামীণ হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নও চলছে।
হয়েছে আরও বেশকিছু কাজ। ১২১ কোটি টাকায় ২২টি বড় মাপের কাজ। যেমন, পেভার্স ব্লকের রাস্তা, জয়েস্ট ব্রিজ, প্রেক্ষাগৃহ ইত্যাদি। তা সত্ত্বেও যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ধূপগুড়ি নিরাপদ আসন নয়, তা তৃণমূলও জানে। এই বিধানসভা এলাকার ১২টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা এবং একমাত্র শহর ঘুরলে স্পষ্ট হয় কারণটা। পাওয়ার আনন্দের চাইতে হয়তো না পাওয়ার জ্বালা অনেক বেশি।
পানীয় জল, আবাস যোজনায় বরাদ্দ এবং জঞ্জাল অপসারণ নিয়ে ধূপগুড়ি শহরের নাগরিকদের ক্ষোভ চরমে। কলেজ রোডের ওপর এক দোকানদারের চাঁছাছোলা কথা, ‘৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকার ঘর পাওয়ার আশায় পুরোনো ঘর ভেঙে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকতে হয়েছে। শেষে বছরের পর বছর অপেক্ষা করে বরাদ্দ না পেয়ে সুদে টাকা ধার নিয়ে ঘরের কাজ শেষ হয়েছে। এই যাঁদের অবস্থা, তাঁরা তৃণমূলকে ভোট দেবেন কেন?’
সুর মেলালেন পাশে দাঁড়ানো আরেকজন। যাঁর কথায়, ‘আবর্জনায় যে শহরে পথ চলা দায়, যে শহরে উদ্বোধনের ৯ বছর পরেও প্রকল্পের জল মেলে না, সেই শহরে তৃণমূল ভোট চাইবে কোন মুখে!’ তাছাড়া শুধু ভোটের প্রচারে তো ভোট আসে না। মিছিল, মিটিংয়ে প্রভাবিত হন মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ। ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত লাভলোকসানের (লক্ষ্মীর ভাতা, কৃষকবন্ধু, স্বাস্থ্যসাথী কিংবা অন্য কিছু পাওয়া) হিসেব কষে ভোট দেন।
৬০ শতাংশই আগে থেকে ঠিক করে রাখেন কাকে ভোট দেবেন। পরিসংখ্যানে স্পষ্ট, ধূপগুড়ি পুর এলাকার এমন ভোটারদের মতামতেই বারবার ধাক্কা খায় বাংলার শাসকদল। ২০১৯ থেকে সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। ২০১৭ সালে ১৬টি ওয়ার্ডের ১২টিতে জিতে পুরসভা দখলের দু’বছরের মধ্যে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এই শহরে ৫৭৮৮ ভোটে পিছিয়ে পড়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনেও শহরে ৩৯৮৩ লিড নিয়ে ধূপগুড়ি থেকে ৪৩৫৫ ভোটে জিতেছিলেন বিজেপির বিষ্ণুপদ রায়। তাঁর মৃত্যুর পর ২০২৩-এর উপনির্বাচনে শহরে সেই লিড হাজারের নীচে নেমে যাওয়ায় জয়ী হন তৃণমূলের নির্মলচন্দ্র রায়। কট্টর তৃণমূল সমর্থকরা স্বীকার করেন, সময় বেঁধে মহকুমার প্রতিশ্রুতি না দিলে লিড কমানো অসম্ভব ছিল। উপনির্বাচনে জয়ও আসত না।
বছর ঘুরতে সেই হিসেব আরও স্পষ্ট হয়ে যায় বিধায়ক নির্মলচন্দ্র রায় প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও ২০২৪-এর লোকসভায় ফের শহরে বিজেপির লিড দাঁড়ায় ৬৯৩৬। শহরে মানুষের ক্ষোভের আরেক কারণ, পুর বোর্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিন বছরেও পুরভোট না করা। সেই পুরসভায় এখন প্রশাসক মহকুমা শাসক। তাতে নাগরিক পরিষেবা কার্যত থমকে গিয়েছে। অথচ পুর এলাকায় লিড না বাড়লে শাসকের কপালে দুঃখ অনিবার্য।

