নকশাল আন্দোলনের উত্তাল সময়ে প্রেমিককে বাঁচানো থেকে শুরু করে, ৫৩ বছর আগে অসবর্ণ বিবাহ করে সমাজের চোখরাঙানি সহ্য করা। অঞ্জলি রায় ও বংশীবদন বসাক সবই সামলেছেন হাতে হাত রেখে। তাঁদের গল্প, গল্প হলেও সত্যি।
সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: ভালোবাসা সমাজ মানে না। যে কোনও প্রাচীন সংস্কার ধুয়েমুছে যায় দুটো মানুষের সামনে। আবার প্রয়োজনে বিদ্রোহের মুখে একে অন্যের হাত ধরে শক্ত হয়ে। অঞ্জলি রায় ও বংশীবদন বসাকের গল্প বলতে শুরু করলে এমন ভূমিকা লেখাটাই যথাযোগ্য হবে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যা খুব একটা সহজ নয় তা প্রায় আধা শতাব্দী আগে করে দেখিয়েছিলেন ওই দম্পতি। একে তো প্রেম, তাও অসবর্ণে, সব মিলিয়ে প্রায় সামাজিক সাইক্লোন সামলে জয়ী হয়েছিলেন পেশায় শিক্ষক স্বামী-স্ত্রী। অশক্ত দুই শরীরে স্মৃতি কিছুটা ঘোলাটে হলেও আজও সেই বাঁধন কিন্তু অটুট। ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল চার হাত এক হওয়ার পর থেকে ৫৩ বছরের অধ্যায়টা যেমন ঘটনাবহুল এবং বর্ণময়। রাজবংশী অঞ্জলির সঙ্গে ভাটিয়া বংশীবদনের প্রেম এবং বিয়ের টানটান উত্তেজনার গল্প শোনা যায় পরিবারের সদস্যদের মুখেও। পড়তি শীতে সেই গল্পে জমে উঠল আসর।
অঞ্জলি রায়ের বাবা দেবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ধূপগুড়ির (Dhupguri News) পূর্ব মল্লিকপাড়া গ্রামের তৎকালীন মোড়ল এবং বেশ প্রভাবশালী। জাতীয় কংগ্রেসের তাবড় নেতাও ছিলেন তিনি। বিধায়ক, মন্ত্রী নেতাদের নিত্য আনাগোনা ছিল অঞ্জলিদের বাড়িতে। দেবেন্দ্রনাথের হাতেই কার্যত তৈরি হয় পূর্ব মল্লিকপাড়া বিএফপি স্কুল এবং সংলগ্ন পূর্ব মল্লিকপাড়া হাইস্কুল। বাড়িতেও পড়াশোনা, গানবাজনার চলের মধ্যেই বাড়ির বড় মেয়ে অঞ্জলি মাধ্যমিক পাশের আগে থেকেই পূর্ব মল্লিকপাড়া প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে পাশের হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতে এসেছিলেন ধূপগুড়ির বংশীবদন। স্মার্ট, শিক্ষিত ও সুন্দর বংশীবদনকে মন দিতে দেরি করেননি অঞ্জলি। এরমাঝে বংশীবদন শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে পুরোদস্তুর নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। একবার পুলিশ যখন তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে সেসময় অঞ্জলি নিজের বিশাল বাড়ির একটি ঘরে কাঠের সিন্দুকে বংশীবদনকে লুকিয়ে রেখে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। দূরত্ব বাড়লেও স্পষ্টবক্তা, সৎ এবং বিপ্লবী মানসিকতার পুরুষটির প্রতি অঞ্জলির আকর্ষণ কমেনি। একসময় ফের মোগলকাটা প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করতে ফেরেন বংশীবদন। ততদিনে দুজনেই একসঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করে ফেলেছিলেন। মেয়ের ভালোবাসাকে অসম্মান করেননি দাপুটে দেবেন্দ্রনাথও। স্থানীয় মানুষের কটাক্ষের মধ্যে তিনি মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্য সম্প্রদায়ের পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্তের জন্য সমালোচনা শোনার পাশাপাশি তাঁকে ঘেরাও অবধি হতে হয়েছিল। তবে শেষপর্যন্ত জমজমাট বিয়েবাড়িও হয়েছিল।
বহুবছরের দাম্পত্য কাটিয়ে কাজিপাড়া বিএফপি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০০৮ সালে অবসর নিয়েছেন বংশীবদন। স্ত্রী অঞ্জলিও ২০০৭ সালে অবসর নিয়েছেন গোঁসাইরহাট বিএফপি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। বর্তমানে দুই ছেলে-বৌমা নাতি নাতনি নিয়ে ভরা সংসার দুজনের। সংসারের কাজের মধ্যে এত দীর্ঘ পথ চলা প্রসঙ্গে অঞ্জলি রায়ের বক্তব্য, ‘মাধ্যমিক পাশ করার আগেই স্কুলে পড়াতে শুরু করি। এরপর নিয়োগপত্রে বয়স বাড়িয়ে দিল। তাতে আমি হয়ে গেলাম কাগজে-কলমে স্বামীর থেকে এক বছরের বড়। সেসব মজার গল্প। আসলে প্রথম দিন থেকেই ওঁর ব্যক্তিত্ব, স্পষ্টবাদিতা, মানুষ ও সমাজের জন্যে ভাবার মানসিকতা আমাকে টানত। আমি চাইতাম ওর সঙ্গেই জীবনটা কাটাব।’

