ডিজিটাল বিপ্লব : প্রবীণরা কি ব্রাত্য?

শেষ আপডেট:

অভিজিৎ পাল

স্মার্টফোন আর কিউআর কোড- বর্তমান সময়ে কেনাকাটার এই দুই চাবিকাঠিই শেষকথা। ঝাঁ চকচকে শপিং মল থেকে পাড়ার একচিলতে মুদি দোকান, সর্বত্রই এখন ডিজিটাল পেমেন্টের দাপট। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, পকেটে নগদ টাকা থাকলেও অনেক দোকানি তা নিতে নাক সিঁটকোচ্ছেন। আজকের জেন ওয়াই বা জেন জেড প্রজন্ম যখন মানিব্যাগ ছাড়াই ঘর থেকে বেরোতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, ঠিক তখনই আমাদের প্রবীণ সমাজের সামনে তৈরি হচ্ছে এক বিশাল ‘ডিজিটাল দেওয়াল’। ইউপিআই-এর গোলকধাঁধায় খেই হারিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠরা আজ এক ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্নরথ কি তবে বাড়ির বয়স্ক সদস্যদের পিষে দিয়ে এগিয়ে যাবে? তাঁদের ব্রাত্য রেখে এই অগ্রগতি কি সত্যিই সম্ভব?

অনলাইন পেমেন্ট বা ইউপিআই ব্যবস্থার উপযোগিতা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই। পকেটে খুচরো পয়সার চিরকালীন ‘ওজন’ থেকে এটি আমাদের ভারমুক্ত করেছে। এক টাকা হোক বা এক লক্ষ- নিখুঁত লেনদেন এখন আঙুলের ডগায়। মাস শেষে খরচের হিসেব মেলাতে ডায়েরি খোলার দরকার নেই, মোবাইলের স্ক্রিনেই সব নথিবদ্ধ। পকেটে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে ঘোরার ঝুঁকি বা ছিনতাইয়ের ভয় থেকেও এই প্রযুক্তি আমাদের রেহাই দিয়েছে। আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে এই প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ।

মুদ্রার উলটো পিঠটি কিন্তু বেশ অন্ধকার। প্রযুক্তির এই আশীর্বাদই প্রবীণ নাগরিকদের একাংশের কাছে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওটিপি শেয়ার করা, খটোমটো ইউপিআই পিন মনে রাখা কিংবা টাচস্ক্রিনের জটিল ইন্টারফেস- এসব তাঁদের কাছে রীতিমতো বিভীষিকা। তার ওপর যদি নেটওয়ার্কের গোলযোগে টাকা কেটে নেয় অথচ পেমেন্ট না হয়, তবে সেই মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা অনেকেরই নেই। ভুল ক্লিকে অচেনা অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাওয়ার ভয় তো আছেই। আজও যাঁরা টু-জি বা ফিচার ফোনে অভ্যস্ত, তাঁদের কাছে এই স্মার্ট দুনিয়া ভিনগ্রহের শামিল। ফলে সামান্য ওষুধ বা বাজার করতে গিয়েও তাঁদের বাড়ির ছোটদের বা অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে। সারাজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচা মানুষগুলোর আত্মসম্মানে যা সরাসরি আঘাত হানছে।

অনলাইন প্রতারণা বা সাইবার ক্রাইম এখন মহামারির আকার নিয়েছে। আর এই ডিজিটাল হাঙরদের সহজ শিকার হচ্ছেন অসহায় প্রবীণরা। প্রশাসন ও ব্যাংক মাঝেমধ্যে সতর্কবার্তা দিলেও সাধারণ মানুষের মনের ভয় কাটছে না। একবার ভুলবশত টাকা খোয়া গেলে তা ফেরত পেতে ব্যাংকের টেবিলে টেবিলে ঘোরার যে হয়রানি, তা মনে করলেই প্রবীণরা শিউরে ওঠেন। সাইবার সেল আছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণের আস্থা অর্জনে আরও স্বচ্ছতা ও তৎপরতা জরুরি।

এই ডিজিটাল বৈষম্য ঘোচাতে হলে প্রযুক্তির খোলস বদলাতে হবে। অ্যাপগুলোর ইন্টারফেস হতে হবে আরও সরল, যাতে চশমা চোখে দেওয়া বৃদ্ধ মানুষটিও ভয়েস গাইড বা সহজ নির্দেশে লেনদেন করতে পারেন। ব্যাংকের কাজ শুধু এসি ঘরে বসে থাকা নয়; নিয়মিত ডিজিটাল ক্যাম্প করে বয়স্কদের হাতে-কলমে এবং ধৈর্য ধরে এই প্রযুক্তির পাঠ দেওয়া তাদের দায়িত্ব। ভুল লেনদেনের ক্ষেত্রে চটজলদি সুরাহার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছার অভাব হয়তো নেই, কিন্তু তার সুফল পৌঁছাতে হবে একদম তৃণমূল স্তরে। আর সবশেষে দায় বর্তায় তরুণ প্রজন্মের ওপর-  তাড়াহুড়ো না করে বাড়ির বড়দের হাত ধরে এই ডিজিটাল দুনিয়ায় হাঁটতে শেখাতে তারা আরও আন্তরিক হোক। প্রযুক্তি হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিভেদ সৃষ্টিকারী নয়।

(লেখক শিক্ষক শিলিগুড়ির বাসিন্দা)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

খাতা-ভাতার গোলকধাঁধায় বন্দি বাংলার শিক্ষা

সনাতন পাল আজকের দিনে আমাদের দেশে এবং বিশেষ করে এই...

নেপালের শিক্ষাবিপ্লব : ভারতের সামনে নতুন দিগন্ত

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী হিমালয়ের কোলে আজ এক নিঃশব্দ কিন্তু প্রলয়ংকরী...

নিরপেক্ষতার প্রতীক এক সাহসী প্রশাসক

ভোটারদের অধিকার সুরক্ষায় এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রথম নির্বাচন...

হে নূতন দেখা দিল আলোক-লগনে

বাংলাদেশে বাঙালির নববর্ষ বহু অমৃতের সন্ধান দিল। মৌলবাদীদের সক্রিয়তার...