ডিজিটাল রিগিংয়ের চক্রব্যূহ কেন্দ্রেরই

শেষ আপডেট:

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

নির্বাচনের আবহ ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে মহালয়ার সকালের মহিষাসুরমর্দিনীর মতো। নেপথ্যে সুর বাজছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নিজস্ব ভঙ্গিতে পাঠ করছেন, ‘শিব দেবীকে দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, ইন্দ্র দিলেন বজ্র, ব্রহ্মা দিলেন কমণ্ডলু’।

এই বুঝি শুরু হল কোনও পরিচিত গান—‘তব অচিন্ত্য রূপ মহিমা’র মতো সুরে ‘তব অচিন্ত্য লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি মহিমা’। এবারের ভোটে সবচেয়ে জনপ্রিয়তম শব্দ হল লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি।

ঠিক সেইভাবেই আধুনিক কোনও ভাষ্যকার বলছেন, ‘বাংলায় বিজেপি প্রধানমন্ত্রী দিলেন নির্বাচন কমিশন ও নতুন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিলেন রাজ্যপাল, সেনা ও পুলিশ। আইনমন্ত্রী দিলেন বিচার ব্যবস্থা।’ এভাবেই বিজেপি সেজে ওঠার চেষ্টায়। যদিও এখনও অনেক হাত খালি।

শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচনে ওপার বাংলায় যে ধরনের কারচুপি হয়েছিল, এপার বাংলার নির্বাচন বোধহয় তাকেও ছাপিয়ে যাবে। সৌজন্যে নির্বাচন কমিশন। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, নির্বাচন কমিশনে আসীন কেন্দ্রের শাসকদলের অনুগামীরা।

স্রেফ কমিশনের গাফিলতির জন্য কত লক্ষ মানুষ এবার ভোট দিতে পারবেন না, তা ভেবে দেখা দরকার। ভোট এই মাসেই। অথচ এখনও বাংলার গ্রামে গ্রামে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন। এই দৃশ্য আগে কখনও দেখা যায়নি। আশা করি, ভবিষ্যতেও দেখা যাবে না।

রাজ্যের বিজেপি নেতাদের মুখে এই নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। কোনও অসন্তোষ নেই। তার কারণ, তাঁরা এভাবেই বিপক্ষ ভোটারদের মাঠের বাইরে রেখে নির্বাচনে নামতে চান। এত লক্ষ লোক ভোট দিতে পারবেন না, অথচ একটি বড় দল এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করছে না। এর মানে কী দাঁড়ায়? পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে মোগাম্বো খুশ হুয়া। তা হতেই পারেন। নির্বাচন কমিশনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেন্দ্রের দলের প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছে।
এই ভোটে এমন কিছু অদ্ভুত ঘটনা দেখছি, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলা ভার। এর মধ্যেই অনেক গল্প লুকিয়ে থাকতে বাধ্য। যেমন দু’দিন আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল, যাঁর নামে ৮৮টি মামলা আছে, তাঁর জামিন হবে কলকাতা হাইকোর্টে। জামিন পাওয়ার পর তিনি প্রার্থী হবেন কলকাতার মেয়রের বিরুদ্ধে। আশ্চর্যের ওপর আশ্চর্য, দুটি ভবিষ্যদ্বাণীই মিলে গেল অবিকল।

আমরা দেখলাম, কোনও কোনও প্রার্থীর ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া নাম অতি দ্রুত ফিরে এল। কোনও বিশেষ ব্যক্তি আদালতে অভিযোগ করলে তাঁর নামও ভোটার তালিকায় উঠে আসছে। অথচ বাংলাজুড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও নির্বাচন কমিশনের কোনও তাপ-উত্তাপ নেই।

বিচারপতিদের দুটি মন্তব্য সরাসরি সংবিধানকে উপেক্ষা করার শামিল।

১, কেউ যদি এই নির্বাচনে ভোট দিতে না পারেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁর অধিকার সারাজীবনের জন্য চলে গেল।

২, ট্রাইবিউনালে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ৩০ বা ৬০ দিন সময় লাগতে পারে। তাই বলে শুধু ‘ম্যাপড’ থাকার কারণে কাউকে ভোটার তালিকায় ঢোকানো যাবে না।

অত্যন্ত দুঃখিত মহাশয়, মানা যাচ্ছে না। ভোট একবার না দিতে দেওয়াটাই চরম অন্যায়। সরকার অধিকার কাড়তে পারে না।

আসলে সরাসরি নির্বাচনে শক্তিহীন সংগঠন নিয়ে বিজেপি পারবে না। এটা বোঝার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় শাসকদল। প্রথমে রাজ্যপাল ও রাষ্ট্রপতি শাসন নিয়ে জল্পনা, তারপর হেমা মালিনীকে ময়দানে নামানো। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো বাহিনী মোতায়েন করা। এরপর এল এই জলজ্যান্ত ভোটারদের উধাও করে দেওয়ার পালা।

বর্তমানে সব পার্টির দুর্নীতিবিদ্ধ থাকার জ্বলন্ত অভিযোগ এখানে হারিয়ে যায়, চাপা পড়ে যায়। দুর্নীতি সব পার্টির নিত্যসঙ্গী, সবে জন্ম নেওয়া হুমায়ুন কবীরের নয়া পার্টিও কেমন এই ক’দিনেই হাজার কোটির ভয়ংকর দুর্নীতির হাত ধরে ফেলেছে।

এর মধ্যে সব মিলিয়ে ক্ষমতায় আসার জন্য বিজেপির চক্রব্যূহ তৈরি। এই চক্রব্যূহ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের বেরিয়ে আসা কঠিন। সাংগঠনিক ক্ষমতা যাই থাকুক না কেন, কাজটা সহজ নয়। লড়াই তীব্রতর। মমতার নিজের কেন্দ্রেই দেখা গিয়েছে প্রতি চারজন মুসলিমের মধ্যে একজনের নাম বাদ। হিন্দুদের ক্ষেত্রেও একজনের নাম বাদ পড়েছে।

কলকাতার প্রাণকেন্দ্রেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে গ্রামের দিকে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সুপ্রিম কোর্টও তাঁদের দিকে আর ফিরে তাকায়নি।

হাসিনা বিরোধী দলগুলোকে রাতারাতি ভ্যানিশ করে দিয়েছিলেন। এখানে রাতারাতি ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে বিরোধী দলের ভোটাররা। সিপিএমের আমলে ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ শব্দবন্ধটি বারবার শোনা যেত। কিন্তু ভোট হওয়ার আগেই যদি কারচুপি হয়, তাকে কী বলা যায়?

যা চলছে, তাকে রিগিংয়ের পিতামহ বলা যেতে পারে—ডিজিটাল ইন্ডিয়ার প্রি-ভোটিং ডিজিটাল রিগিং। সময় এগোচ্ছে, বিজ্ঞান এগোচ্ছে। তাই রিগিংয়ের ধরনেও বদল আসছে। যেন বলা হচ্ছে, চলো ভাই অনেক আগেই আমরা আমাদের কাজ সেরে ফেলি!

ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ কেন আরও আগে করা হল না, এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই কারও কাছে। সেই প্রশ্নটাই অনেকের মুখে ঘুরছে, ভোট কি পোস্ট ডেটেড চেকের মতো যে নির্বাচনের পর ভাঙানো যায়। জিন্দাবাদ, মুর্দাবাদ, ভোট দিন—এসব নয়। আগেই বলেছি, এবারের ভোটে জনপ্রিয়তম শব্দ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। যা এই ডিজিটাল রিগিংয়ের প্রধানতম অঙ্গ, প্রধানতম রঙ্গ।

–অমুক ৫০ বছর ধরে ভোট দিয়ে কেন এবার তালিকা থেকে বাদ?

–ওটা তো লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি?

–তমুকের পরিবারে ৭ ভোটারের মধ্যে ৫ জন কেন বাদ?

–ওটা তো লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি!

লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি জিন্দাবাদ! ওই যে মহিষাসুরমর্দিনীর সুরে গান বাজছে, ‘তব অচিন্ত্য লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি মহিমা’।

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

জটিল অর্থনীতি, সহজ পাঠ মোদির 

অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত সোনার গয়না কেনা বা নিজের গাড়িতে চেপে প্রতিদিন অফিসে...

রং পালটে ক্ষমতার কাছে ফেরার মরিয়া চেষ্টা

দীপ সাহা শিকারির হাত থেকে বাঁচতে, কখনও বা সঙ্গিনীর নজরে...

তৃণমূলিকরণ ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব শমীকের?

গৌতম সরকার গৈরিকীকরণ স্বাভাবিক। কিন্তু দুয়ারে বিপদ তৃণমূলিকরণের! বিজেপির জন্য...

স্বৈরতন্ত্রের পতন তো সর্বত্র এভাবেই হয়

রূপায়ণ ভট্টাচার্য সান্ধ্য জাগো বাংলার ৩ মে’র শিরোনাম : কাল...