ফুটপাথে শুধু রুটি-পরোটা, চা বিক্রিই নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে এক অজানা টান। তাই শহরের আনাচে-কানাচে বদল এলেও বদলায়নি দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের সামনে থাকা ফুটপাথের দৃশ্য। হাসপাতালের প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে এক কাপ চায়ের ধোঁয়ায় মিলিয়ে যায় ক্লান্তি-অবসাদ।
প্রসেনজিৎ সাহা, দিনহাটা: মঙ্গলবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১১টা। দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের (Dinhata Hospital) পাশ দিয়ে যেতেই কানে এল ‘ও দাদা এদিকে আসুন গরম গরম চা খেয়ে যান, মন ভালো হয়ে যাবে।’ আপনার শুনে মনে হতে পারে এ তো চা বিক্রেতাদের রোজকার হাঁক। বিক্রি বাড়ানোর ফন্দিফিকির। কিন্তু দিনহাটা (Dinhata) হাসপাতাল সংলগ্ন ফুটপাথের কাহিনীটি কিন্তু ভিন্ন। হাসপাতালের সীমানা পাঁচিলের ওপার যখন হাসিকান্না, মন খারাপের উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার ভাড়ে নিস্তেজ। তখন পাঁচিলের এপারে ফুটপাথে গদাই বর্মন ও নিত্যনন্দ মোদকের দোকানে উলটো ছবি। চায়ের ভাড়ের ধোঁয়া, রুটির গন্ধ আর জীবনের আরেক নতুন অধ্যায়কে লিখে চলেছেন প্রতিনিয়ত। মন ভার থাক বা খুশি, তাঁদের দোকানের এক কাপ চা যেন রোগী ও তাঁর পরিজনদের কাছে সঞ্জীবনী। দীপঙ্কর সাহা এদিন সকালে মাকে নিয়ে এসেছিলেন হাসপাতালে। শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় তাঁর মাকে চিকিৎসক ভর্তি লিখে দেন। সেই থেকে দৌড়াদৌড়ি। আর বাড়িতে খাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। ফুটপাথের দোকানের চা ও রুটি খেয়েই দিন কাটান দীপঙ্কর। একই বক্তব্য সুস্মিতা গুনেরও। তাঁর কথায়, ‘হাসপাতালের মতো জায়গায় দৌড়ঝাঁপের কারণে খাওয়ার কথা সেভাবে খেয়াল থাকে না। যখন খিদে পায় তখন হাসপাতালের ফুটপাথের ধারে চায়ের দোকানগুলিই আমাদের ভরসা।’
প্রতিদিন সকাল হতেই টগবগে কেটলির শব্দে জমে ওঠে দোকান। চা আর পরোটা হাতে হাসপাতালের গেট পেরিয়ে আসা রোগীর আত্মীয়দের ভিড়। কেউ রাত জেগে থাকা ক্লান্ত চোখে চুমুক দেন চায়ে, কেউ চায়ের ধোঁয়ায় খুঁজে নেন স্বস্তির নিঃশ্বাস। দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝেও এই দোকানেই যেন একটু উষ্ণতা, একটু ভরসা। গদাইয়ের কথায়, ‘হাসপাতালে আসা মানুষজন অনেক সময় কষ্টে, দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকেন। তাই তাঁদের একটু ভালোবাসা দিয়ে চা দিই, কখনো-কখনো তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা শুনি। ওঁরাই তখন আমাদের আপন মনে করে নেন। এই তো জীবন।’
আরেক দোকানি নিত্যানন্দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ফুটপাথের এই দোকান দিয়েই সংসার চলে তাঁর। নিত্যানন্দ ও তাঁর স্ত্রী দুজনে এই দোকান চালান। তাঁর কথায়, ‘সকাল থেকে এই দোকানে চলে আসি। এরপর কীভাবে সময় চলে যায় তা বুঝতেই পারি না। বর্ষায় একটু অসুবিধা হয় ঠিকই, কিন্তু কখনও থেমে থাকেনি আমাদের চুলা।’ এককথায় দশকের পর দশক থেকে হাসপাতালের এই ফুটপাথ গদাই-নিত্যানন্দদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু রুটি-পরোটা আর চা বিক্রিই নয়। এরসঙ্গে মিশে রয়েছে এক অজানা টান। আর তাই শহরের আনাচেকানাচে বদল এলেও বদলায়নি দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের সামনে থাকা ফুটপাথের দৃশ্য। হাসপাতালের প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে এক কাপ চায়ের ধোঁয়ায় মিলিয়ে যায় ক্লান্তি, দুঃখ। রোগীর পরিজন সুনীল দাসের কথায়, ‘রোগীকে নিয়ে সারাদিন দৌড়ঝাঁপের পর এক কাপ চায়ের পাশাপাশি মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার যদি কেউ থাকেন তা হলেন এই দোকানিরা। তাই চায়ের পাশাপাশি এখানে এলে অতিরিক্ত হিসেবে মেলে আত্মিকতা।’

