কৌশিক দাস, ক্রান্তি: জমিয়ে শীত পড়েছে। ডুয়ার্সমুখী পর্যটকদের গাড়িগুলি ছুটে চলেছে ওদলাবাড়ির দিকে। সেই পথেই দিগন্তবিস্তৃত চা বাগান আনন্দপুর। বাগান পেরিয়ে চারদিক অরণ্যে ঘেরা বনবস্তি ষোলোঘরিয়া। দুপুরের অলসতার মধ্যেও অদ্ভুত নান্দনিক এখানকার পথঘাট। ধানখেত পেরিয়ে বনাঞ্চল, শাল গাছের বৃহৎ আবছায়ায় লুকিয়ে ময়ূর।
তবে ছবির মতো এই গ্রাম যে শহুরে জাঁকজমক থেকে লক্ষযোজন ব্যবধানে রয়েছে সেকথা কেবল গ্রামবাসীরাই জানেন। সন্ধ্যার পর জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ যেন এখানে থমকে দাঁড়ায়। পরিবারের একমাত্র কর্মজীবী মানুষ কখন বাড়ি ফিরবে এই অপেক্ষায় ও উদ্বেগে পরিবারের দিন কাটে (Dooars)।
কয়েক মাস আগের ঘটনা। বাবাকে হাতির পায়ে পিষ্ট হতে দেখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে পড়ুয়া রীতেশ ওঁরাও। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর রীতেশের বাবা রোহিত ওরাওঁ আপাতত সুস্থ। ছোট্ট রীতেশের মতো বনবস্তির খুদেরা জানে অদৃষ্টের এই নির্মম পরিণতির কথা।
এছাড়া ফসল তোলার মরশুমে বাড়ির পুরুষদের টংঘরে থাকতে হয়। না হলে ঘরে ফসল তোলা অসম্ভব। এভাবেই এলাকার কত তরুণ ঘুমহীন রাত কাটিয়েছেন তার ঠিক নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা তথা এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য নারায়ণ ওরাওঁ প্রশাসনের ওপর যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, ‘এলাকায় উন্নয়ন কোথায় বলুন? কর্মসংস্থান থেকে শুরু এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবকিছুর বেহাল দশা। চাষবাস করার উপায় নেই। হাতি এসে ফসল নষ্ট করে। হাতি তাড়াতে গেলে পদপিষ্ট হতে হয়।’
রাজাডাঙ্গা পেন্দা মহম্মদ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়া রিয়া ওরাওঁ, অনিশা শৈব, শ্রিয়া শৈব ও আলেক্স ওরাওঁ এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। ষোলোঘরিয়া বনবস্তির এক দরিদ্র চা শ্রমিকের সন্তান হওয়াই যেন তাঁদের ‘অপরাধ’। অরণ্যঘেঁষা পথ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে পৌঁছানো তাদের পক্ষে অসম্ভব। অথচ দু’চোখে শিক্ষকতার স্বপ্ন। কিন্তু উপায় নেই। বন্যপ্রাণীর কবল থেকে প্রাণে বাঁচতে হবে তো!
ষোলোঘরিয়া বনবস্তি আপাতদৃষ্টিতে প্রাণচঞ্চল হলেও এখানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। ফলে সন্ধ্যার পর গোটা এলাকা প্রাণহীন হয়ে পড়ে। যোগাযোগ ব্যবস্থা তথৈবচ। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতাল পৌঁছানোর উপায় নেই। এভাবে এলাকার অনেক অসুস্থ বাসিন্দা চিকিৎসার অভাবে মারা গিয়েছেন। রাজাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মিন্টু রায়ের কথায়, ‘এলাকার উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে সব কাজ হবে।’

