অনুপ সাহা, ওদলাবাড়ি: সবে শীত পেরিয়ে একটু একটু করে তাপমাত্রার পারদ বাড়তে শুরু করেছে ডুয়ার্সের। ১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে এলেনবাড়ি থেকে একের পর এক নদী পেরিয়ে যাওয়ার পথে নদীর পাশে জমিয়ে রাখা বালির স্তূপ থেকে ঠিকরে আসা সোনালি ঝলকে চোখ ধাঁধিয়ে যায় (Illegal Sand Mining)। লিস-ঘিস-চেল তিন নদীকে নিয়ে কারবার সারা বছরই চলে। বর্ষার কয়েকমাস বাদ দিলে বছরের বাকি দিনগুলোতে অফুরন্ত অর্থের জোগান দিয়ে চলে এই তিন নদী। ভোেটর বাজারে এই তিন নদীর কারবারিরা যাঁর পাশে সেই নেতার তো ‘সোনে পে সুহাগা’। তাই ওই কারবারিদের দরজায় এখন প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে নেতাদের বা তাঁদের অনুচরদের পা পড়ছে।
বালি-পাথরের অবাধ চোরাকারবার ওদলাবাড়ি থেকে মালবাজার শহরের আগে পর্যন্ত ভূ-প্রাকৃতিক মানচিত্রটাই বদলে দিচ্ছে। নদীর বুকে যেখানে-সেখানে অবাধে খননের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিটাই হারিয়ে গিয়েছে। কোথাও আবার প্রাকৃতিক নিয়মেই পালটা পাড় ভাঙছে নদী। লিস নদীর চরে দাঁড়িয়ে এক চা শ্রমিক বৃদ্ধার আক্ষেপ, ‘আগে নদীটা কত দূরে ছিল, এখন পাথর চুরির চোটে নদী আমাদের ঘরের দুয়ারে চলে এসেছে। বর্ষায় ভয়ে দু’চোখের পাতা এক করতে পারি না।’
এই হাহাকার আজ ডুয়ার্সের ঘরে ঘরে, যেখানে নদীর গতিপথ বদলে দিচ্ছে প্রভাবশালী বালি কারবারিদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের আঁতাত। কাঁচা টাকার জোরে সেই কারবারিরা এতটাই প্রভাবশালী যে, তাঁদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করার সাহস হয় না কারও।
স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়, ‘রাতের অন্ধকারে যখন ত্রিপল ঢাকা দিয়ে পাথরবোঝাই ট্রাকগুলো বের হয়, তখন মনে হয় যেন যুদ্ধ চলছে। পুলিশ-প্রশাসন সব জানে, কিন্তু ওপরতলার নেতার হাত আছে ওদের মাথার ওপর। তাই কেউ মুখ খোলে না।’
গজলডোবার তিস্তা সেতু দিয়ে ওভারলোডেড ডাম্পারের যাতায়াত এতটাই যে, সম্প্রতি কয়েক মাস সেতু বন্ধ রেখে সংস্কারের কাজ করতে হয়েছে ব্যারেজ কর্তৃপক্ষকে। সেই সময় সেতু এতদিন বন্ধ রাখা চলবে না, এই দাবি করে রীতিমতো রাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখান ডাম্পার মালিকরা। কিন্তু কেন অবৈধভাবে বালি-পাথর তুলে সেতু দিয়ে ওভারলোডেড ডাম্পার নিয়ে যাওয়া, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি কোনও রাজনৈতিক দল।
আসলে এই গোটা কারবারটা নিয়ন্ত্রণ করে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যাদের সঙ্গে শাসক ও বিরোধী উভয়পক্ষেরই আঁতাত। ভোটের বাজারে ওই সিন্ডিকেটের নেতাদের কদর আরও বেশি। ওই নেতাদের আবার কোনও না কোনও পার্টির সঙ্গেও ওঠাবসা। বেশিরভাগ সময়ই কারবারের সুবিধার জন্য সিন্ডিকেটের নেতারা রাজ্যের শাসকদলের সঙ্গেই থাকেন। সম্প্রতি এমনই এক নেতাকে গলায় মালা পরিয়ে একটি রাজনৈতিক দল ফিরিয়ে নিয়েছে তাদের পার্টিতে। চেল নদীর পাড়ে বসে সিন্ডিকেটের এমনই এক নেতা সরাসরি বললেন, ‘নদী থেকে পাথর না উঠলে রাস্তা হবে কীভাবে? আমাদের এলাকার হাজার হাজার ছেলে এই কাজ করেই তো পেটের ভাত জোগাড় করে।’
এলাকায় কোনও শিল্প নেই। জমির কারণেও কৃষিতেও এই এলাকা পিছিয়ে। ভরসা বলতে চা বাগানগুলো। তাও এখন অনেকটাই ধুঁকছে। এলাকার এই দারিদ্র্যকে ঢাল করেই সিন্ডিকেটের নেতারা বছরের পর বছর নদী লুটের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজ্যের শাসকদলের এক নেতা কিছুটা ইতস্তত করে বলেই ফেললেন, আসলে এখানকার মানুষগুলোর কাছে আর কি বিকল্প আছে? বালি-পাথরের কারবার বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক লক্ষ মানুষের ভাত জুটবে না।
এই হাভাতে মানুষগুলোকে সামনে রেখে তাই দশকের পর দশক ধরে জঁাকিয়ে বসেছে বালি-পাথরের কারবার। সেই কারবারে ছোট নেতারা সিন্ডিকেটের মাথা। তাঁদের আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন বড় নেতারা। ২০২৬-এর নির্বাচনের হাওয়া উঠতেই এই বোঝাপড়া আরও সক্রিয়। বালি-পাথরের এক কারবারি হাসতে হাসতেই বললেন, ‘যা ব্যবসা করেছি তার একটা বড় অংশ ভোটের বাজারে দিয়েছি। কোন দলকে সেটা আর জিজ্ঞেস করবেন না। দরজায় এসে সবাই হাত পাতেন।’
প্রশাসনের তরফে মাঝেমধ্যে দু’-একটি ডাম্পার আটক করা হলেও রাঘববোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। নদী থেকে লুট হওয়া বালিতে তৈরি হচ্ছে ক্ষমতাবানদের বিলাসবহুল প্রাসাদ। লিস-ঘিস-চেল পাড়ের বস্তির মানুষগুলো জানতেও পারছেন না নদীর বুক খুঁড়ে তারা অজান্তে নিজেদের কবর খুঁড়ছেন।

