দিনহাটা: রাজ্য, দেশ হোক বা বিদেশের মাটি, ঢাকের আওয়াজ শুনে বাঙালির উৎসব শুরু হয়। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী থেকে নবমী বা বিজয়া দশমীর বিসর্জন সবেতেই ঢাক হল অপরিহার্য। তবে যাঁদের হাতের জাদুতে ঢাকের কাঠিতে বাজনার ম্যাজিক শুরু হয়, পুজোর মরশুমে তাঁদের অবস্থাটা ঠিক কেমন? সময় বলছে উৎসবের সময় যখন তাঁদের ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকার কথা, সেসময়ই তাঁরা বেশ স্তিমিত। একসময় পেটলা গ্রাম পঞ্চায়েতের বোড়োডাঙ্গা গ্রাম থেকে দুর্গাপুজোর মরশুমে ঢাকিরা বায়না নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় এমনকি ভিনরাজ্যেও যেতেন। অসম বা ত্রিপুরায় তাঁদের কদর ছিল বেশি। তাঁদের বাজনার সুরে মেতে উঠত পুেজামণ্ডপ। তবে এবার আসন্ন দুর্গাপুজোর আগে এলাকার ঢাকিরা অতটাও উচ্ছ্বসিত নন। তাঁদের দুঃখ ভিনরাজ্য থেকে আর আগের মতো ডাক আসে না। তাই তাঁদের জীবনধারণে সংকট গভীর হচ্ছে। পেশায় জড়িত শিল্পীরা অনেকক্ষেত্রেই কাজ হারাচ্ছেন।
একসময় বোড়োডাঙ্গার ঢাকিরা শুধু দিনহাটাতেই নয়, গোটা উত্তরবঙ্গেই বিশেষ পরিচিত ছিলেন। এলাকার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঢাক বাজানোকেই পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। দুর্গাপুজো ছাড়াও বিয়ে, নানা ব্রতপালন অনুষ্ঠান, সামাজিক উৎসবে তাঁদের ডাক পড়ত। এদিকে, পুজোর মরশুমে ভিনরাজ্যে যাওয়া মানেই ছিল নিশ্চিত আয়ের সুযোগ। এলাকার এক ঢাকি জয়দেব ব্যাধের কথায়, ‘এখন পুজো প্যান্ডেলে সাউন্ডবক্স, ডিজে বা ব্যান্ড বেশি গুরুত্ব পায়। আগে যতজন ঢাকি থাকতেন, এখন আর ততজন থাকেন না। বাইরে থেকেও ডাক কমেছে।’


অন্যদিকে, স্থানীয় উৎসবে ঢাকিদের চাহিদা থাকলেও পারিশ্রমিক অল্প। তাই সারাবছরের খরচ জোগাতে হিমসিম খেতে হয় বলেও তিনি জানালেন। অপর ঢাকি দেবজ্যোতি ব্যাধ বললেন, ‘আগে পুজোর সময় অসমে যেতাম। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত বাজালে মোটা টাকা আয় হত। এছাড়া সারা বছর অন্যান্য অনুষ্ঠানে বাজিয়েও সংসার চলে যেত। তবে গত কয়েকবছর ধরে বাইরে থেকে আর সেভাবে ডাক আসে না। অন্য অনেক মানুষ সেখানে নিজেরাই ঢাক বাজানো শুরু করছেন’ স্বাভাবিকভাবেই তাই এলাকার ঢাকিরা পেশা ছেড়ে বাধ্য হয়ে দিনমজুরি, রাজমিস্ত্রির কাজ কিংবা চাষের কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। নবীন প্রজন্মও ওই পেশা থেকে ক্রমশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
এনিয়ে এলাকার প্রবীণ ঢাকি জয়দেব ব্যাধের কথায়, ‘ঢাকিদের রক্ষার উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। স্থানীয় পুজো কমিটি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির এবিষয়ে এগিয়ে আসা দরকার। সরকারি বা বেসরকারি স্তরে যদি ঢাকিদের জন্য প্রশিক্ষণ শিবির, শিল্পী ভাতা বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যায়, তবে হয়তো আবার ঢাকের সুর তার প্রাপ্য সম্মান ফিরে পাবে।

