শুভঙ্কর চক্রবর্তী
পরিবর্তন না প্রত্যাবর্তন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছবিটা স্পষ্ট হবে৷ রাজনীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে কোনও নেতার কথায় বা মনের মধ্যে পুষে রাখা আক্রোশের বশে অথবা জয়ের উল্লাসে কোনও সহনাগরিককে আঘাত করার আগে, কারও ক্ষতির কথা মাথায় এলে হাজারবার ভাবুন। একজনের মুহূর্তের উল্লাস বা ক্ষোভ যেন অন্যের জীবনে অন্ধকার ডেকে না আনে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের; শাসক, বিরোধী, নির্দল, সক্রিয় সমর্থক, রাজনীতি নিরপেক্ষ, সকলের।
এক মুহূর্তের জন্য বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে কিছু হিসেবনিকেশ করি। রাজনীতির উত্তাপে কেউ হয়তো একজনের মাথায় লাঠি মারলেন, তিনি পাশের বাড়ির প্রতিবেশী, পরিচিত কিংবা অপরিচিত যে কেউ হতে পারেন। যাঁকে মারলেন সেই ব্যক্তি যখন কোনও নার্সিংহোমে ভর্তি হবেন, তখন তাঁর অবস্থাটা ঠিক কেমন হবে? ধরা যাক, মাথায় গুরুতর চোট নিয়ে তিনি পাঁচদিন নার্সিংহোমে থাকলেন। আজকের দিনে একটা সাধারণ মানের নার্সিংহোমে পাঁচদিনের বেডভাড়া, ওষুধ, রক্ত পরীক্ষা, স্ক্যান, ডাক্তারের ভিজিট ইত্যাদি মিলিয়ে অন্তত দেড় লক্ষ টাকার বিল হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়। এবার ভাবুন আহত সেই মানুষটির কথা, যাঁর দৈনিক উপার্জন হয়তো বড়জোর তিনশো টাকা। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলে তিনি মাসে নয় হাজার টাকা হাতে পান। যাঁর মাসিক আয় নয় হাজার টাকা, তাঁর পক্ষে দেড় লক্ষ টাকার বিল মেটানো কি কোনওভাবেই সম্ভব? সারা মাসের উপার্জনের পুরোটাই দিয়ে দিলেও ১৬ মাসেও দেড় লক্ষ টাকা মেটানো সম্ভব নয়।
তাহলে কী করবেন সেই ব্যক্তি? বাড়ি ফিরতে হলে জমানো যা পুঁজি ছিল তা তো শেষ হবেই, তারপর হয়তো নিজের সম্বল বলতে থাকা সামান্য জমি বা ঘটিবাটি বন্ধক রাখতে হবে অথবা নিতে হবে চড়া সুদে ঋণ। এই যে সর্বস্বান্ত হওয়া, এর দায় কি কোনও রাজনৈতিক দল নেবে? নেতারা কি এসে সেই নার্সিংহোমের বিল মিটিয়ে দেবেন? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা- না, কেউ আসবেন না। গল্প কি এখানেই শেষ? না, শেষ নয়। নার্সিংহোম থেকে ফিরেই কাজে যোগ দিতে পারবেন না তিনি। বড় কিছু না হলেও তাঁকে আরও কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে হবে, ওষুধ খেতে হবে। সেই সময় সংসার চালানোর টাকা আসবে কোথা থেকে? ওষুধের টাকা কে জোগাবে? এরকম অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে না। দিনের শেষে রাজনীতিতে গা ভাসাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হবেন ব্যক্তিটি। নেতারা তো নয়ই, রাজনৈতিক হানাহানিতে মূলত আর্থিকভাবে সচ্ছলরা সামনের সারিতে কোনওদিনই থাকেন না। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষজন, যাঁরা ফোকটে দু’পয়সা উপার্জনের জন্য নেতার পেছনে ঘোরেন এমন মানুষরাই সবার আগে লাঠি হাতে দৌড়ে বেড়ান। আর সেই মানুষগুলোর গড়পড়তা আয় দৈনিক তিনশো টাকার বেশি নয়। তাই তেমন মানুষদেরই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
একইভাবে ভাবুন, ভাঙচুর হওয়া সেই ছোট্ট দোকান বা বাড়িটির কথা। উত্তরবঙ্গের বহু মানুষ আজও কাঠ আর টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়িতে থাকেন। একটা মোটামুটি মানের কাঠ আর টিনের ঘর তৈরি করতে কমপক্ষে দুই লক্ষ টাকা খরচ হয়। আর একটা ছোট মুদিখানা দোকান সাজাতেও লাগে প্রচুর পুঁজি। ধরুন রাজনৈতিক আক্রোশে কারও দোকান লুট হল বা ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হল। যে ব্যক্তিটি তিল তিল করে বছরের পর বছর ধরে টাকা জমিয়ে ওই সম্বলটুকু করেছিলেন, এক নিমিষেই তিনি পথের ভিখারি হয়ে গেলেন। নতুন করে সেই ঘর তুলতে গেলে তাঁকে আবার অন্তত দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে অথবা আমৃত্যু ধুঁকতে হবে ঋণের জালে। নেতা হয়তো জনসভায় দাঁড়িয়ে বড় বড় ভাষণ দেবেন, কিন্তু সেই ভাঙা ঘর সারানোর জন্য নিজের পকেট থেকে এক টাকাও দেবেন না। পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনী অথবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর ঘেরাটোপে নেতারা সুরক্ষিত থাকেন, অসুরক্ষিত শুধু যে কোনও দলের সাধারণ সমর্থকরা। যাঁরা প্রকাশ্যে কোনও দলের সমর্থক নন, রাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে থাকেন, ভোটের বাজারে অসুরক্ষিত তাঁরাও। রাজনীতি থেকে দূরে থাকা সেই মানুষটিও বাজার করতে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হতে পারেন, বিজয় মিছিল থেকে উল্লাসের বশে বাজারের কোনও দোকান, বাড়ি ভেঙে দেওয়া হতে পারে। তখন সেই মানুষটি কোনও অন্যায় না করেও সর্বস্বান্ত হবেন।
এসবের পরে আসবে পুলিশের অত্যাচারের কাহিনী। গণ্ডগোল হলে প্রকৃত অপরাধী বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক গুন্ডাদের না ধরে পুলিশ নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতে নিরীহ মানুষদের গ্রেপ্তার করে কেস দেবে। তারপর জেলের ঘানি টেনে, বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা আর তারজন্য উকিলকে টাকা দিতে দিতে ভিখারি হয়ে যাবেন ওই মানুষগুলি। এটাই ভোট পরবর্তী হিংসার কঠিন বাস্তব। বাংলায় এমন কোনও অবস্থা বা উদাহরণ এখন পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দল তৈরি করতে পারেনি, যার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে এর অন্যথা হবে বা হতে পারে।
তাই সময় এসেছে ভাবার। যে প্রতিবেশী আজ অন্য দল করছেন বলে আপনি তাঁর ওপর চড়াও হচ্ছেন, মনে রাখবেন বিপদের দিনে নেতার আগে ওই প্রতিবেশীই আপনার পাশে এসে দাঁড়াবেন। মাঝরাতে আপনার বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে দিল্লির বা কলকাতার নেতা এসে হাত ধরবেন না, ধরবেন আপনার পাশের বাড়ির সেই মানুষটিই, যাঁর সঙ্গে আপনি রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়েছিলেন। রাজনীতি আসবে যাবে, কিন্তু সামাজিক বন্ধন চিরন্তন। রাজনীতি বিভেদ তৈরি করে আর সমাজ আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তাই কোনও নেতার কথায় প্ররোচিত হয়ে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা বা করার কথা ভাবার আগে হাজারবার চিন্তা করুন। জয়োল্লাস করুন সংযতভাবে, আর হারের দুঃখ হজম করুন ধৈর্য ধরে। পাশের বাড়ির লোকটির সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করবেন না, কারণ রাজনীতির রং ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের পরিচয়টাই শেষকথা। আপনার ক্ষণিকের উন্মাদনা যেন কোনও পরিবারের সারাজীবনের কান্না হয়ে না দাঁড়ায়। নিজের বোধবুদ্ধি দিয়ে বিচার করুন, শান্ত থাকুন এবং পাড়াকে পাড়া হিসেবেই থাকতে দিন, রণক্ষেত্র করবেন না। দিনের শেষে আমরা সবাই সাধারণ মানুষ, আর আমাদের লড়াইটা শুধু দুই বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য, কোনও পতাকার রংকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য নয়।
ভোট আসে, ভোট যায়। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান ওঠে, দেওয়ালজুড়ে রঙের লড়াই চলে, আর টিভির পর্দায় চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু ভোটের ফল বেরোনোর পর আসল ছবিটা কি খুব একটা বদলায়? জেতা বা হারা, তৃণমূল হোক বা বিজেপি, ক্ষমতার হাতবদল হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের যাপনের লড়াইটা একই তিমিরে থেকে যায়। ফল প্রকাশের পর যে আদিম উল্লাস বা প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হয়, তাতে বারবার বলি হয় সেই সাধারণ মানুষই। হিংসার বিরুদ্ধে নেতারা অনেক ভালো ভালো ভাষণ দেন, কিন্তু সেসবের বাস্তব রূপ আমরা সবাই জানি। তাই রাজনৈতিক দলের সমর্থক না হয়ে সহনাগরিকের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে শান্তিপ্রিয় আমআদমিকেই হিংসা রুখতে হবে। সম্প্রীতি আর ভালোবাসায় তৈরি সুস্থ সমাজ আর নিরাপদ পরিবারই আমাদের একমাত্র আশ্রয়।



