Thursday, July 25, 2024
Homeসম্পাদকীয়উত্তর সম্পাদকীয়দার্জিলিংয়ের মানসিকতার বদল যন্ত্রণার

দার্জিলিংয়ের মানসিকতার বদল যন্ত্রণার

স্কুল জীবনে দার্জিলিংয়ে কাটানো কেউ সেখানে ধাক্কা খান প্রতিপদে। ম্যালে অজস্র দোকান। পালটাচ্ছে শৈলশহর।

সৌমিত্র রায়

আমার ভালোবাসার সেই দার্জিলিংটা আজ আর নেই, কোথায় হারিয়ে গেল মিষ্টি হাসিগুলো সেই, আজ আর নেই। এমনই মনে হল ক’দিন আগে আমার শৈশবের দার্জিলিং থেকে নামার পথে।

এই মন খারাপের কারণটা ঠিক বোঝাতে পারব কি না জানি না। কিন্তু সেই দার্জিলিং, যেখানে আমার জীবনের আট বছর কেটেছিল ১৯৭০ থেকে ১৯৭৭ সাল, আর আজকের দার্জিলিঙের অনেকটাই তফাত। হ্যাঁ, বলতে পারেন ৪৬-৪৭ বছরের পার্থক্যে গোটা পৃথিবী বদলে গিয়েছে নিয়ম আর সময়ের পেন্ডুলামে দুলে দুলে। কিন্তু যেটা আমাকে ভাবাল সেটা হল, ওখানকার মানসিকতার পরিবর্তন।

বর্ষার দিনে দার্জিলিং পৌঁছাতে মাত্র আড়াই ঘণ্টা লাগল। সুকনা ফরেস্ট পেরিয়ে পাহাড়ের রোহিণী রোড ধরে কার্সিয়াং এক ঘণ্টায়, আর ৮ মাইল, টুং, সোনাদা, ঘুম পেরোতে আরও দেড় ঘণ্টা। যদিও গাড়ির জ্যাম কোথাও পেলাম না, আমি কিন্তু বাতাসিয়া লুপের সেই মুক্ত, নিঃশব্দ পরিচয়টা পেলাম না। লুপের চারদিকে দোকান আর হকাররা ঘিরে থাকায় ওই প্রথম দার্জিলিংয়ের দৃশ্যটা উধাও।

পর্যটকদের ভিড় বর্ষার সময় এমনিতেই কমে যায়, কিন্তু শিলিগুড়ির দার্জিলিং মোড় থেকে সুকনার দিকে যেতে খেয়াল করছিলাম, দু’দিকেই দোকান আর বাড়িগুলো প্রায় গায়ে গায়ে। ভাগ্যিস টয়ট্রেনের লাইনটার উপর কেউ বসেনি এখনও।

এলিস ভিলা হোটেলের ঘরে জিনিসপত্তর রেখেই মন চাইল, দু’মিনিটের পথ চড়ে সেই প্রিয় চৌরাস্তায় যাই। কিন্তু ওইটুকু পথ তো পুরোটাই হকারদের দখলে। আর শুরু থেকে শেষপর্যন্ত প্লাস্টিকে ঘেরা। হাঁটার জায়গাটা মাত্র ৩-৪ ফুট চওড়া আর প্রতি মুহূর্তে কারও না কারও সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া।

এত মানুষ এই বর্ষার সময় দার্জিলিংয়ে কী করছে? তাঁরা প্রায় সবাই অবাঙালি। জামাকাপড়, সোয়েটার, বিভিন্ন রকমের ছাতা, স্কার্ফ, টুপি, ফুচকা, মুড়ি, গরম ভুট্টা বড় বড় ফ্লাস্কে চা- সব পাওয়া যাচ্ছে। খদ্দেররা এতদূর থেকে এসে এইসব কিনছেন কেন? প্রচুর দরদাম করেই কিনছেন। নিজেদের শহরে পাওয়া যায় না? এখানে এসে ভিড় করতে হবে? কী বিরক্তিকর ব্যাপার বলুন তো?

হালকা বৃষ্টির কারণে ম্যাল বা চৌরাস্তা এলাকাটা একটু ফাঁকা পেলাম। যাক, বৃষ্টির জয় হোক ভেবে ওই বিখ্যাত গ্লেনারিজ-এর দিকে গেলাম। নেহরু রোড দিয়ে চকবাজারে দু’পা এগিয়েই আমার বাঁদিকে দেখলাম লাইন করে তন্দুরি চিকেন পকোড়া আর নানারকম খাবার পাওয়া যাচ্ছে। গরম মোমোগুলো বেশ লোভনীয় কিন্তু এই এলাকায় ভিড় করে বিক্রি হবে কেন? এটা কি কলকাতার এক্সাইডের মোড়?

সামনে তাকিয়ে দেখি সেই সাংগ্রিলা রেস্টুরেন্টটাও নেই। তার মালিক নাকি বার লাইসেন্স আর হোটেলটা বেচে দিয়ে চলে গিয়েছেন অন্য কোথাও। নামমাত্র একটা ছোট সাইনবোর্ড আর একটা অল্প সিটের বার-কাম রেস্টুরেন্ট রয়ে গিয়েছে! তার ঠিক উলটোদিকে একটা কিউরিও স্টোরের মালিক আমার সমবয়সি এবং পুরোনো বন্ধু। সে আমাকে অনেক দিন পর দেখে জড়িয়ে ধরে নেপালি ভাষাতেই জিজ্ঞেস করল, ‘হে দাজু, কসতো ছ?’ যখন তাকে বললাম যে আমি এই বর্ষার সময়ে ভিড় দেখে অবাক, সে বলল, এখন আর ‘ট্যুরিস্ট সিজন’ বলে কিছু নেই। সারাবছর পর্যটকরা দার্জিলিংয়ে যায় আর তাতে ওখানকার মানুষের উপকার হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ে। লাভ হয়। নতুন প্রজন্ম দেশ-বিদেশের ইউনিভার্সিটি গুলোয় পড়াশোনা আর চাকরি করতে যায়। ভালো কথা, সেটাই তো হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সব রাস্তাগুলোর পরিবেশ বাণিজ্যের জন্য বদলে যাবে?

গ্লেনারিজের ভেতরটাও পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। প্রবেশ করার পর অন্তত ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করতে হল শো-কেসের মধ্যে লোভনীয় পেস্ট্রিগুলোর দর্শন পেতে! কয়েকটা প্যাটিস আর কেক প্যাকেজ করানোর পর লাইনে দাঁড়িয়ে অনলাইন পেমেন্ট করলাম। এত মানুষের ভিড়ে গ্লেনারিজের সেই আসল সুগন্ধটা হারিয়ে গিয়েছে। আর পেলাম না আগের মতো পুরোনো ওয়েস্টার্ন গানের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। কিছু একটা বাজছিল। কিন্তু সেটা হয়তো উপরের তলায় রেস্টুরেন্টে। বেরোবার সময় কাউন্টারে বলে এলাম যে, দু’দিন পর আমি এক কিলো চকোলেট নেব। মহিলা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘ওয়ান কেজি?’ আমি এক গাল হেসে বললাম ‘ইয়েস, আই অ্যাম এন ওল্ড কাস্টমার অফ গ্লেনস’!

পরের দিন বিকেল হতেই হালকা বৃষ্টিটা ভারী বৃষ্টিতে পরিণত হল। ঠিক যেমন আশা করেছিলাম। ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম গভর্নর্স হাউসের দিকে। রাস্তার ঢালে গড়ানো বৃষ্টির জল আমার স্নিকার্সটার ভিতরে ঢুকে আমাকে মনে করিয়ে দিল নানা কথা। এই রাস্তা দিয়েই আমি স্কুল জীবনের প্রথম প্রেমিকার সঙ্গে নীরবে হেঁটেছিলাম ম্যাল পর্যন্ত এক ছাতার তলায়। তার সঙ্গে ভাব হয়েছিল আমাদের দুই স্কুলের সোশ্যালে। এখন ভাবলে মনে হয় পুরোটাই যেন স্বপ্ন ছিল। আজও বৃষ্টি আছে, ছাতা আছে, ভেজা জুতো আছে, ম্যালে সেই বেঞ্চটা আছে, নেই শুধু সে। কোথায় আছে, কেমন আছে, জানা নেই।

ম্যাল পর্যন্ত ধীরে ধীরে এগোলাম, কিন্তু কিছুদূর গিয়ে আবার অবাক হলাম দেখে যে, এই আড়ালের রাস্তাটাও প্রচুর হকাররা দখল করে নিয়েছে। বুঝলাম, বৃষ্টির কারণে খদ্দেরদের ভিড় তখন কম। কিন্তু শুনলাম, এই শান্ত পরিবেশের রাস্তাতেও নাকি পা ফেলার জায়গা থাকে না ট্যুরিস্ট সিজনে!

আগে ম্যাল পেরিয়ে কয়েকটা ঘোড়ার স্টল ছিল। আর চার্লস ব্রনসন বা ক্লিন্ট ইস্টউডদের মতো টুপি পরে সেই ঘোড়ার মালিকগুলো চওড়া বেল্ট পরে পায়চারি করত। ওই ঘোড়াগুলো আবার মাঝেমাঝেই থেমে যেত ম্যাল রোডের রেলিংয়ের ধারে ঘাস চিবোবে বলে। আমরা জানতাম, পায়ের দুটো গোড়ালিতে হালকা গুঁতো দিলেই তারা আবার পথে ফিরে যেত। আর একটু জোরে ‘ছু’ বললেই সেই ঘোড়া দৌড়োত। ঘোড়া দৌড়োলে স্যাডলে বসে আপ-ডাউন করার টেকনিক জানলে ঝাঁকুনি আর কোমরে ব্যথা কম হত। যে ট্যুরিস্টরা পারত না, তাদের অবস্থা দেখে আমরা ছাত্ররা হাসতাম আর ভাবতাম ‘বেশ হয়েছে! বাঁদর টুপি পরে ঘোড়া চড়লে এরকমই হবে!’

এবার দেখলাম ঘোড়ার ‘স্টেবল’ টাই নেই। সব দোকান হয়ে গিয়েছে আর পর্যটকরা চিপস, কোল্ড ড্রিংক্স, মোমো ইত্যাদি খেতে ব্যস্ত। দু’-একটা ঘোড়া ম্যালের মাঝেই বাচ্চাদের বসিয়ে আহ্লাদি বাবা-মায়েদের সেলফি তোলার সুযোগ করে দিচ্ছে। পুরোনো সিনেমার দিন শেষ!

দার্জিলিংয়ে বাণিজ্য হচ্ছে, ব্যবসা বেড়েছে ভালো কথা। কিন্তু আমার মনে হয়, পর্যটকদের ভিড়ে কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে চলাফেরা করা একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার। ‘কংক্রিট হ্যাজ রিপ্লেসড গ্রিনারি’ বলে দুঃখ করল আমার এক কাশ্মীরি বন্ধু, যার দোকানে ঢুকলে এখনও সেই পুরোনো দার্জিলিংয়ের গন্ধটা পাওয়া যায়। আবার আমার আরেক স্থানীয় স্কুলের বন্ধু বলল, ‘বাট দার্জ ইজ দার্জ। উই উইল অলওয়েজ লাভ ইট’!

সত্যিই তো, আমরা বারবার ফিরে যাব দার্জিলিংয়ে। যতই ভিড় হোক। তাই না?

(লেখক গায়ক। দার্জিলিংয়ে স্কুল জীবন কাটিয়েছেন আট বছর)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
- Advertisment -spot_img

LATEST POSTS

Paris Olympic 2024 | অলিম্পিকের প্রথম ম্যাচেই তুমুল অশান্তি, মরক্কোর কাছে ১-২ গোলে হেরে...

0
উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ প্যারিস অলিম্পিক্সে প্রথম ম্যাচেই হেরে গেল কোপা জয়ী আর্জেন্টিনা। মরক্কোর বিরুদ্ধে ১-২ গোলে হেরে গেল লিয়োনেল মেসির দেশ। এদিনের ম্যাচে...

Potato traders strike | ধর্মঘট প্রত্যাহার ব্যবসায়ীদের, বৃহস্পতিবার থেকে বাজারে স্বাভাবিক হবে আলুর যোগান...

0
উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিলেন আলুব্যবসায়ীরা। বুধবার রাত থেকেই রাজ্যের হিমঘর থেকে আলু বেরিয়ে বাজারমুখী হবে। বৃহস্পতিবার থেকে বাজারে স্বভাবিক হবে...

DY Chandrachud | ‘সিকিউরিটি কো বুলাও’, শুনানি চলাকালীন মেজাজ হারিয়ে হুংকার চন্দ্রচূড়ের

0
নয়াদিল্লি: সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) নিট ইউজি শুনানির সময় মঙ্গলবার আচমকাই মেজাজ হারালেন দেশের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় (DY Chandrachud)। এক প্রবীণ আইনজীবীকে প্রকাশ্যে...

India-Sri Lanka series | ভারত সিরিজের দল ঘোষণা, শ্রীলঙ্কার নেতৃত্বে আসালাঙ্কা, ফিরলেন চান্ডিমল

0
কলম্বো: সিরিজের দামামা বাজিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রে পা রেখেছে ভারতীয় দল। গৌতম গম্ভীর জমানার শুরুর অপেক্ষায় তাকিয়ে ক্রিকেট মহলও। পারদ চড়িয়ে এদিন দল ঘোষণা করল শ্রীলঙ্কাও।...

Kerala | মস্তিষ্কের জটিল অসুখকে জয়, সুস্থ হয়ে উঠল কেরলের কিশোর

0
নয়াদিল্লি: অ্যামোবিক মেনিঙ্গোএনসেফালাইটিস। মস্তিষ্কের বিরল সংক্রমণ। একবার সংক্রামিত হলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। এই সংক্রমণে মৃত্যুর হার ৯৭ শতাংশ। গোটা বিশ্বে...

Most Popular