সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: ভোটের সময় চড়া টোনে মিটিং, মিছিল হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই প্রচারের (Election Campaign) ঝড়ে দলীয় পতাকা, পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানার থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। সরাসরি বা সমাজমাধ্যমে প্রচার, সবেতেই এমন ছবিই ফুটে ওঠে। নজরে আসে প্রাকভোটের হুইস্পারিং। কিন্তু এর বাইরেও প্রচার চলে। দলীয় পতাকা, ব্যানারহীন সেই প্রচার অনেক বেশি নিবিড় এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে।
বিজেপির হয়ে ঠিক এমন কাজই করে আরএসএস এবং কয়েকটি শাখা সংগঠন। স্বয়ংসেবকরা যা করেন, তা ‘জাগরণ কর্মসূচি’। তৃণমূলের এমন কোনও ছায়া সংগঠন কোনওদিনই ছিল না। কিন্তু এবার প্রচারের ময়দানে হাজির ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ফ্যান ক্লাব’। আরএসএসের মতো সংগঠিত না হলেও, তৃণমূলের (TMC) প্রমীলা বাহিনী ফ্যান ক্লাবের নামে বাড়ি বাড়ি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। যা চোখ এড়াচ্ছে না অনেকের। তবে জোড়াফুল নারী বাহিনীর প্রচারে থাকছে না দলীয় পতাকা বা নিদেনপক্ষে প্রার্থীর নাম সংবলিত কোনও ব্যানার। শোনা যাচ্ছে না সরাসরি তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার উগ্র আবেদনও। প্রচারের হাতিয়ার শুধু রাজ্য সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প। কৌশলে মহিলা ভোটব্যাংকের আবেগ ছুঁয়ে বকলমে তৃণমূলের ভোট নিশ্চিত করা। সেই কাজে তাঁরা দারুণভাবে সফল বলেও দাবি ফ্যান ক্লাব সদস্যাদের। ২০২৩ সালে ধূপগুড়ির বিধানসভা উপনির্বাচনের মুখে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে প্রচারের সুবাদেই এমন ভাবনার জন্ম বলে তৃণমূলের অন্দরের খবর। ধূপগুড়ি শহরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকজন তৃণমূল মহিলা কর্মী সম্মিলিতভাবে ওই সময় এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁরা ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। উপনির্বাচনে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে লিড মিলেছিল।


এরপরই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে প্রথমে ওয়ার্ডের মহিলাদের শামিল করা হয়। পরবর্তীতে আশপাশের মহিলারাও যোগ দেন। ’২৬-এর নির্বাচনে ফ্যান ক্লাব পুরোদস্তুর ময়দানে নেমেছে দলের হয়ে পরোক্ষ প্রচারে। ধূপগুড়ি লক্ষ্মী ভাণ্ডার ফ্যান ক্লাবের সম্পাদক রুমা দত্তের কথায়, ‘সাধারণ একজন গৃহবধূর কাছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিছক ভাতা নয়, বরং আত্মসম্মান। বিরোধীদের প্রতিশ্রুতি দিবাস্বপ্ন, কিন্তু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কঠিন বাস্তব। আমরা নারীদের আত্মসম্মান দেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারই চাই। প্রার্থী বা প্রতীকের ঊর্ধ্বে নারীর অহংকারই আমাদের প্রচারের বিষয়বস্তু।
প্রচারের জন্যও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রতীক তৈরি করেছেন ফ্যান ক্লাবের সদস্যারা। বাড়ি বাড়ি প্রচারে গৃহস্থালির কথাবার্তার পাশাপাশি মহিলাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বিশেষ গ্রিটিংস কার্ড। সরাসরি ভোটের কথা না বলেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের (Lakshmir Bhandar) মতো ব্যক্তিগত মুনাফা দেওয়া প্রকল্পের লাভ সম্পর্কে মহিলাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন ফ্যান ক্লাবের সদস্যারা। শুরু থেকে এই ফ্যান ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক তথা কর্মকাণ্ডের পরামর্শদাতা তৃণমূলের জেলা নেতা রাজেশকুমার সিং বলেন, ‘বিজেপির প্রতিশ্রুতির সামনে দাঁড়িয়ে মহিলারা বুঝছেন, স্বপ্নে অমৃতি খাওয়া থেকে বাস্তবের নকুলদানা অনেক ভালো। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে সামনে রেখে ফ্যান ক্লাবের সদস্যারা জাগরণের কাজ করছেন।’
বাড়ি বাড়ি মহিলা ভোটারদের আকর্ষণ করতে তৃণমূলের প্রমীলা বাহিনীর এহেন উদ্যোগকে অবশ্য গুরুত্ব দিতে চাইছেন না বিজেপি নেতারা। তাঁদের দাবি, বিজেপি সরকার গড়ার পর জুন মাস থেকেই মহিলাদের মাসিক ভাতা তিন হাজার টাকা হবে, এমন ঘোষণার পর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে আর আবেগ নেই ভোটারদের। বিজেপির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক চন্দন দত্ত বলেন, ‘তৃণমূলি ফ্যান ক্লাবের সদস্যরা আগে বলুন, দু’মাস পর থেকে বিজেপি সরকার যে মাসিক তিন হাজার টাকা দেবে, তা না নিয়ে ওঁরা মাসে দেড় হাজার টাকায় খুশি থাকবেন কি না? বাংলার মা-বোনেরা তৃণমূলের এইসব সস্তা ভাঁওতা আর খাচ্ছেন না। এসবে লাভ হবে না।’
ভোটের জয়-পরাজয়ের হিসেব এখনও ইভিএমে বিন্দ হওয়া বাকি। তার আগে কেউই এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়। তার প্রমাণ মিলছে ইস্যুর ভিড়ে। তাতে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে তিন হাজার বনাম দেড় হাজারের লড়াই।

