ভোটের ভাষ্য

শেষ আপডেট:

প্রতিশ্রুতি ছাপিয়ে প্রহারের বয়ান। রাজনৈতিক নয়, ভোটের ভাষ্য হয়ে উঠছে আস্ফালন। কেউ নরম ভাষায়, কারও মুখে চড়া সুরের হুমকি। ভোটের ভাষণে হিংসার আমদানি হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিল। হুমকির ভাষ্যে শামিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী, দল নির্বিশেষে নেতারা। রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার চরম প্রতিফলন যেন। যাতে লাগাম টানার বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই কোনও দলের।

ভোটের বয়ানে হিংসার সর্বোচ্চ নমুনা খুনের হুমকি। যা শোনা গিয়েছে তৃণমূল ত্যাগী বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের মুখে। যিনি নতুন দল তৈরি করেছেন। যে দলের প্রধান কর্মসূচি বাংলায় বাবরি মসজিদের প্রতিষ্ঠা। দিন কয়েক আগে এক স্টিং অপারেশনে হুমায়ুনের সঙ্গে বিজেপির গোপন নির্বাচনি সমঝোতার ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। তার সত্যতা যাচাই করা যায়নি। তবে বিজেপির অন্যতম সর্বোচ্চ নেতা তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র ভাষণে সেই ঘটনায় দায় ঝেড়ে ফেলার বার্তা আছে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে ক’দিন ধরে শা বলে বেড়িয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে কিছুতেই বাংলার মাটিতে বাবরি মসজিদ করতে দেবে না। তীব্র প্রতিক্রিয়ায় হুমায়ুন হিংসার বার্তার আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি সরাসরি হুমকি দিয়েছেন, বাবরি মসজিদ নির্মাণে কেউ বাধা দিতে এলে তাঁর লাশ ফেলে দেওয়া হবে। এমনও বলেছেন যে, শেষপর্যন্ত মসজিদ না হলে প্রস্তাবিত জমিটি হয়ে উঠবে ২০০ বাধাদানকারীর সমাধিক্ষেত্র।

এত খুল্লম খুল্লা খুনের হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন এখনও কোনও পদক্ষেপ দূরের কথা, প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত জানায়নি। যদিও কমিশনকে পদক্ষেপ করতে হলে শুধু হুমায়ুন নয়, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কেও ভাবা প্রয়োজন। গত কয়েকদিনের প্রচারে তিনি বারবার উলটো করে ঝুলিয়ে শায়েস্তা করার হুঁশিয়রি শুনিয়েছেন। এভাবে অতীতে পুলিশ কথা বার করার জন্য অনেক ধৃতকে শাস্তি দিত। মস্তানদের মুখেও উলটো করে ঝুলিয়ে দেওয়ার আস্ফালন বহুলপ্রচলিত ছিল।

হিংসার সেই ভাষা মাত্রা ছাড়িয়েছে শা’র মুখে ভোটের দিন ঘর থেকে বেরোলে তৃণমূলের ‘গুন্ডাদের’ গণনার পরদিন পাইকারি হারে গ্রেপ্তার বা দুর্বৃত্তদের বেছে বেছে চরম শাস্তি দেওয়ার হুমকি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখের এই ভাষা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তির বিরোধী। কেননা, গুন্ডা, মস্তান, দুর্বৃত্তদেরও গণতন্ত্রে ভোটাধিকার নিশ্চিত। জেলে পুরে না রাখলে তাঁদের ভোটদান আটকানো যায় না।

তাছাড়া ভারতের মতো রাষ্ট্রে দোষীকে সাজা দেওয়ার জন্য বিচার ব্যবস্থা আছে। রাষ্ট্র নিজে কখনও নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ করতে পারে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য গণতন্ত্রের সেই আধারকে লঙ্ঘন করছে। অত চড়া ভাষায় না হলেও বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তৃতাতেও অশান্তির প্রচ্ছন্ন ভাষা লুকিয়ে আছে। আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলার সভাগুলিতে কার্যত প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলে চলেছেন, ভোট পর্যন্ত দিল্লি কা লাড্ডু খেতে পারলেও তারপর বাংলার তিলের নাড়ু, মোয়া খাওয়ানো হবে।

নির্বাচন উত্তর সময়ে আইনশৃঙ্খলা রাজ্য সরকারের হাতে থাকবে বলে উল্লেখ করে কার্যত প্রশাসনকে চাপে রাখার বার্তার মধ্যে এক ধরনের অগণতান্ত্রিক ভাবনা স্পষ্ট। ভোট প্রচারের প্রথম দিকে মুখ্যমন্ত্রীর মতো দায়িত্ববান পদে থেকেও তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আটকানোর জন্য মহিলাদের হাতা-খুন্তি, ঝাড়ু নিয়ে মোকাবিলার ডাক দিয়েছিলেন। এই আহ্বান কার্যত হিংসায় উসকানির শামিল।

এছাড়াও সব দলের নেতা-মন্ত্রীদের প্রচারে অশান্তির বাতাবরণ স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশন কোনও ক্ষেত্রেই পদক্ষেপ না করায় সকলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। দলগুলির রাজনৈতিক মতবাদ, ভাবনা ইত্যাদি প্রচার একেবারে গৌণ হয়ে উঠেছে। আদর্শগত প্রচারের সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করছে একদিকে রাশি রাশি প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে হুমকি, আস্ফালন, হুঁশিয়ারি ইত্যাদি। ভোটের বয়ানে ক্রমে রাজনৈতিক প্রচার লঘু হয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব ক্রমশ বহুদলীয় নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ভোটারদের মনে লঘু করে দিচ্ছে।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

কংগ্রেসে সমস্যা

গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও কংগ্রেস কার্যত সমার্থক। স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকে...

সঙ্গী চাই!

ভাগ্যের পরিহাস। ইতিহাসের পরিহাসও বটে। নতুন সঙ্গী খুঁজতে হচ্ছে...

প্রত্যাশা বহু

পঁচিশে বৈশাখ আপামর বাঙালির কাছে চিরন্তন আবেগের দিন। রবীন্দ্রনাথের...

বন্দনায় মরিয়া

হারের পর্যালোচনা নয়। দলের ভবিষ্যৎ রোড ম্যাপ নির্ধারণ নয়।...