বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬

অন্তহীন ক্ষত ও অনিশ্চিত প্রতিকার

শেষ আপডেট:

বিশ্বজিৎ দত্ত

ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ৪১ বছর পেরিয়ে গেল। ১৯৮৪ সালে ৩ ডিসেম্বর রাত ১টার সময় ভোপাল শহরে ইউনিয়ন কার্বাইড সংস্থার কারখানায় E610 ট্যাংকে মজুত থাকা প্রায় ৪০ টন বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট (MIC) এক ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বাতাসে মিশে যায়। দুর্ঘটনার প্রথম তিনদিনে মারণ গ্যাসের প্রভাবে প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে আরও পনেরো হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। এছাড়া, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সারা জীবনের জন্য কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সেই মানুষগুলো শরীরে নানা রোগব্যাধি আর যন্ত্রণা আজও বহন করে চলেছেন। কিন্তু তাঁরা আজও প্রকৃত ক্ষতিপূরণ পাননি। অপরাধীরাও সাজা পায়নি।

দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কারখানার রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকেই দায়ী করা হয়। ৭ ডিসেম্বর ইউনিয়ন কার্বাইডের মার্কিন কর্তা ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে গ্রেপ্তার করে সংস্থার অতিথিশালায় গৃহবন্দি করা হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে জামিন দিয়ে মধ্যপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিংহের নির্দেশে রাজ্য সরকারের বিশেষ বিমানে দিল্লি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিমানের ক্যাপ্টেন সৈয়দ আলির সাক্ষ্য অনুযায়ী বিমানের লগবইয়ে সেই বিশেষ বিমানের সম্পর্কে লেখা ছিল ‘Flight authorized by CM’। ৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অতিসক্রিয়তায় আরেকটি বিশেষ বিমানে অ্যান্ডারসনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর আর কোনও দিন বিচারের জন্য তাঁকে ভারতবর্ষে ফেরত আনা যায়নি। কী কারণে তাঁকে ফেরত পাঠাতে সরকারের এত সক্রিয়তা ছিল তা আজও জানা যায়নি।

গ্যাস বিপর্যয়ের পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র ও বহুমুখী। কেন্দ্র সরকার তৎক্ষণাৎ ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এবং ঘটনাটির দায় নির্ধারণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। দুর্ঘটনার পরই কেন্দ্রীয় সরকার একটি বিশেষ আইন- Bhopal Gas Leak Disaster (Processing of Claims) অ্যাক্ট ১৯৮৫ পাশ করে। যাতে সরকারই সব ক্ষতিপূরণের দাবি আইনি পথে উপস্থাপন করতে পারে। এই আইনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের বোঝা কমানো হয়। পরবর্তীতে মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। ১৯৮৯ সালে আদালতের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতা হয়, যেখানে সংস্থাকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কেন্দ্র ও মধ্যপ্রদেশ সরকার পুনর্বাসন, পরিবেশ পরিষ্কার এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেয়। অপরাধমূলক দায় নির্ধারণের জন্য আলাদা ফৌজদারি মামলা চলতে থাকে, যদিও ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে বহু বিতর্কও তৈরি হয়। এদিকে, মার্কিন আদালতে ৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করার পরেও ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মাত্র ২৪ দিনের শুনানির শেষে ভারত সরকার মাত্র ৪৭০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ নিয়ে ইউনিয়ন কার্বাইডের সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তিতে রাজি হয়ে যায়। এনিয়ে আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে, এমনকি বামপন্থীদেরও কখনোই সেরকম জোরালো প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলতে দেখা যায়নি। কারণও সামনে আসেনি।

(লেখক চিকিৎসক ও অক্ষরকর্মী। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরীক্ষা নাকি তথ্যের রাজত্ব?

রাহুল দাস বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং গবেষণার মানদণ্ড নির্ধারণে...

বৃহন্মুম্বই নির্বাচন স্রেফ স্থানীয় ভোট নয়

চিরঞ্জীব রায় ঠাকরেদের দীর্ঘ ৩০ বছরের অজেয় দুর্গ দখল করে...

অসুরের অন্তিম প্রস্থান ও আমাদের বিবেক

সাধন দাস মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের সুরের সঙ্গে পর্দায়...

‘গডফাদার’ ট্রাম্প ও মার্কিন গণতন্ত্রের ফানুস

নীহারিকা সরকার ইদানীং একটা কথা প্রায়ই কানে আসে, ‘ধুর মশাই!...