হরষিত সিংহ, মালদা: রাস্তার পাশে পুরোনো বট গাছের নীচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটা প্রাচীন পাথর। বছর পঞ্চাশের দরবারি ঘোষ, তুলনায় তরুণ সুরজিৎ ঘোষ সহ জনাছয় গল্পগুজব করছিলেন। পাশে ভ্যানে বসে সাব-মার্সিবল পাম্পের জন্য বোরিং করা দেখছিলেন তরুবালা ঘোষ। সরু পিচের রাস্তার ওপারে গৌড়ের সৌধ বারোদুয়ারি। বট গাছের নীচে ছায়ায় পর্যটকদের ছোট গাড়ি, টোটো দাঁড়ানো। চৈত্রের দুপুরেও আনাগোনা আছে পর্যটকদের।
আড্ডা মারছিলেন যাঁরা, তাঁদের কাছে গিয়ে আশপাশে শৌচালয় আছে কি না, খোঁজ করলেন এক পর্যটক। বারোদুয়ারির পাশের শৌচালয়টি তালাবন্ধ। দরবারি ঘোষ ওই পর্যটককে জানালেন, কিছুই নেই গৌড়ে। কত লোক আসেন এখানে। তাঁদের জন্য না আছে থাকার ব্যবস্থা, না আছে বিশ্রামের জায়গা। তাঁর আক্ষেপ, ‘কেউ কিছু করেন না গৌড়ের জন্য।’
সাইকেলে বসেই দুধ বিক্রেতা সুভাষ ঘোষ বলে উঠলেন, ‘আস্তে আস্তে গৌড়টা শেষ।’ প্রাচীন বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়। মালদা জেলায় ইংরেজবাজারের (English Bazar Election Battle) বিস্তীর্ণ এলাকায় আম বাগানের মধ্যে ছড়িয়ে এখন প্রাচীন সেই নগরীর বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ। গঙ্গা-মহানন্দা দিয়ে অনেক জল গড়ালেও এসবের সংরক্ষণ, পর্যটনের পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেই বাংলার অতীতের রাজধানীতে।
পর্যটক আসবেন কী, ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতেও গৌড়ের রাস্তায় জল জমে। নেই নিকাশিনালা, পানীয় জলের ব্যবস্থা। রাস্তা থাকলেও সংস্কার নেই। স্থানীয়দের বসবাসই কঠিন হয়ে উঠছে। পার্বতী মণ্ডলের বাড়ির সামনে জমে রয়েছে বৃষ্টির জল। ক্ষোভ ঝরে পড়ল তাঁর গলায়, ‘বুঝলেন তো মশাই, কেউ আসেন না দেখতে।’ ভোটের কথায় তাঁর নিরাসক্ত জবাব, ‘জানিই তো না কে বা কারা প্রার্থী! তবে ভোট দেব। কিন্তু কাজ যেন হয়।’
মালদা জেলা সদরের বিধানসভা কেন্দ্রের নাম ইংরেজবাজার। লাগোয়া গ্রামীণ এলাকাও আছে এই কেন্দ্রে। তৃণমূল ২০১১ সাল থেকে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকলেও উপনির্বাচন ছাড়া আর কখনও ইংরেজবাজারে জেতেনি। ২০১১ সালে কংগ্রেসের টিকিটে জিতেছিলেন কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী। ২০১৩ সালে তিনি তৃণমূলে যোগ দিয়ে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে পর্যটনমন্ত্রী হয়েছিলেন।
কিন্তু ২০১৬ সালে আবার পরাজিত হন নির্দল প্রার্থী নীহাররঞ্জন ঘোষের কাছে। নীহারও পরে তৃণমূলে যোগদান করেন। কৃষ্ণেন্দু-নীহারের সম্পর্ক কোনওদিনই মসৃণ নয়। নীহার তৃণমূলে যোগ দিলে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়ে। সেই সময় কৃষ্ণেন্দুকে সরিয়ে পুরসভার চেয়ারম্যান করা হয়েছিল নীহারকে। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আবার কৃষ্ণেন্দুকে প্রার্থী করে তৃণমূল। নীহারকে চাঁচল বিধানসভায় কেন্দ্রে টিকিট দেয়।
কিন্তু বিজেপি প্রার্থী শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরীর কাছে হেরে যান কৃষ্ণেন্দু। উন্নয়নের শিকে ছেঁড়ার আশায় ঘোর তৃণমূল জমানায় পদ্মের ফুল ফুটিয়েছিলেন ইংরেজবাজারের বাসিন্দারা। সেই স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। ইংরেজবাজার শহরের গৌড় রোড মোড়ে চায়ের ঠেকে নৃপেন দাস বলছিলেন, পাঁচ বছরে বিধায়ককে সেভাবে দেখাই যায়নি। কাজ তো দূরের কথা। বিজেপি ভালো করেছে এবার প্রার্থী বদলে দিয়ে।
শ্রীরূপাকে নিয়ে এমন ক্ষোভ ইংরেজবাজারের আনাচে-কানাচে। এবার বিজেপির প্রার্থী দাপুটে নেতা অম্লান ভাদুড়ি। এই কেন্দ্রে এবার আর টিকিট পাননি কৃষ্ণেন্দু। আশিস কুণ্ডুকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। যাঁর কথা প্রার্থী ঘোষণার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কারও মনে আসেনি। তাঁকে প্রার্থী করায় তৃণমূলের একাংশের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।সিপিএম প্রার্থী অম্বর মিত্র ইংরেজবাজারের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন হলেও নির্বাচনি লড়াইয়ে এই প্রথম। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ৭ হাজার ৭৫৫ ভোট। তৃণমূলের কৃষ্ণেন্দুনারায়ণের ঝুলিতে গিয়েছিল ৮৭৬৫৬। তৃতীয় স্থানে ছিলেন সিপিএম প্রার্থী কৌশিক মিশ্র। গত লোকসভা নির্বাচনেও ইংরেজবাজার বিধানসভা আসনে এগিয়েছিল বিজেপি। বিধানসভা ভোটের তুলনায় লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট বেড়েছিল ইংরেজবাজারে।
অতীতে কংগ্রেসের শক্তঘাঁটি ইংরেজবাজারের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ হত গনি খানের পারিবারিক আবাস কোতুয়ালি ভবন থেকে। সেই ভবনের সঙ্গে ইংরেজবাজারের সম্পর্ক ক্রমশ ফিকে হয়েছে। প্রবীণ হাসমাত শেখ বলেন, ‘আমাদের জন্য অনেক কাজ করেছেন বরকতদা। এখন আর সেদিন নেই।’
কংগ্রেসের প্রার্থী মাসুদ আলম! গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ ভোটাররা যাঁকে কমই চেনেন। ইংরেজবাজারের লড়াইটা এবার দ্বিমুখী। কংগ্রেস কতটা ভোট কেটে কার যাত্রাভঙ্গ করে, তার ওপর ফলাফল অনেকটা নির্ভর করছে। কিন্তু কার্যত কান্ডারিহীন তৃণমূল। শ্রীরূপার ওপর ক্ষোভ থাকলেও বিজেপি কিছুটা এগিয়ে থেকেই শুরু করেছে। গৌড় রোড মোড়ের সেই চায়ের দোকানে সবাই একমত, ‘তৃণমূল কতটা মেকআপ করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করছে হারজিত।

