বৃক্ষই নাম বদলে হতে পারে বিবাহ

শেষ আপডেট:

 

  • সুনন্দ অধিকারী

শিরোনামই বলছে বিবাহ ও গাছকে একসূত্রে গাঁথতে। সেই বন্ধনকালে আমাদের সঙ্গী বিজ্ঞানও। এবার সেই বন্ধনের পালা।

আমরা জানি মানবসভ্যতার শুরুতে বিবাহ প্রথা ছিল না। পরবর্তীকালে মূলত দুটি কারণে নারী-পুরুষ সম্পর্কে আগল লাগল। অবাধ মেলামেশার গণ্ডি কেটে দেওয়া হল। মূলত যা দৈহিক সম্পর্কে জড়ানো নারী-পুরুষ। ফলত আগল পড়ল স্বেচ্ছাচারিতায়।

দ্বিতীয়ত, সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদের অবসান ঘটল। এভাবেই চালু হল বিবাহ প্রথা শুরুতে ধর্মের হাত ধরে। পরবর্তীতে আধুনিক সভ্যতায় সেটাই পর্যবসিত হল আইনে। খুব সংক্ষেপে এই হল বিবাহ নামক প্রথার নেপথ্য কাহিনী। কিন্তু এখানে আমরা বলছি বিবাহ কিনা বৃক্ষতুলনীয়! কিন্তু কীভাবে?

ঠিক এইখানে এসে আমাদের ফিরে তাকানো যাক উপনিষদের দিকে। বৃহদারণ্যকোপনিষদ আমাদের জানাল- সমুদ্র যেমন যাবতীয় জলরাশির একমাত্র মিলনাধার, তেমনই ত্বক সমস্ত স্পর্শের। নাক সব গন্ধের। জিভ রসের। চোখ রূপের। কান শব্দের। মন সংকল্পের। হৃদয় বুদ্ধি বা বিদ্যার। হাত কাজের। জননেন্দ্রিয় সমস্ত আনন্দের। এসব বলে সবশেষে বলল, বাক সমস্ত বেদের একমাত্র গতি। এখানে বাক মানে শব্দ বা বাক্য। মানে শব্দই ব্রহ্ম।

তবে সে যাই জানাক। আপাতত আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ ওই আনন্দকেন্দ্রিক।

কিন্তু কেন? কেননা প্রেম আমাদের আনন্দ দান করে। আর তার চূড়ান্ততম প্রকাশ নারীপুরুষের মিলনে। এক্ষেত্রে মস্তিষ্ক বিজ্ঞানও সঙ্গ দেয় আমাদের। মানুষের অন্যতম ইতিবাচক আবেগ ভালোবাসা ও যৌনতা। অবশ্য এ কেবল নিতান্ত আবেগ বা আনন্দেই সীমাবদ্ধ নয়। তাৎপর্য এর অনেক গভীর। কার্যকারিতা সুদূরপ্রসারী। যৌনতা ছাড়া যেমন প্রজাতির টিকে থাকা অসম্ভব, তেমনই ভালোবাসা ছাড়া শিশুর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

এই আনন্দসূত্র ধরেই আমরা বলতে পারি। ফুল বা প্রেম যদি আমাদের খেলার সঙ্গী হয়। তবে ফল সেখানে প্রয়োজনের সঙ্গী। অর্থাৎ ফুলের সঙ্গে আমাদের আনন্দের সম্পর্ক। কিন্তু যেই সেটা রূপান্তরিত হল ফলে, তখন সেটা নিছক আনন্দ পেরিয়ে পৌঁছে গেল আবশ্যকতায়। আর এইখানেই বিবাহের সঙ্গে মিলে গেল গাছ। অথবা গাছের সঙ্গে বিবাহ।

আবার যৌনতার সঙ্গে জড়িয়ে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম। ডোপামিন আমাদের সুখ এবং আনন্দের অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়। তাই ডোপামিনকে হ্যাপি হরমোন বলে। তবে শুধু ডোপামিন নয়। সেরোটোনিন, অক্সিটোসিন এবং এন্ডোরফিন নামক তিনটে নিউরোট্রান্সমিটার আমাদের ইতিবাচক ভাবনা তৈরি করে। এর মধ্যে অক্সিটোসিনকে বলে লাভ হরমোন।

ভালো বা আনন্দদায়ক কিছু দেখা বা কাজের সময় ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটে। যা আমাদের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে উদীপ্ত ও নিয়ন্ত্রণ করে আনন্দানুভূতি সৃষ্টি করে। এটা তাই প্রেরণাদায়ক হরমোনও বটে। সেরোটোনিন ভালোলাগার সঙ্গে সন্তুষ্টির কথাও বলে।

গাছ প্রাণের ধারক ও বাহক। সে যেমন প্রাণবায়ু দেয়। আবার সেই জোগানকারী খাদ্যের। একটি সুস্থ বিবাহ নারীপুরুষের মিলন অতিক্রম করে দুটি পরিবারকে একত্রিত করে। সেই বন্ধন উত্তর প্রজন্ম সন্তান সৃষ্টির মাধ্যমে লালন করে। ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় সুস্থ স্বাভাবিক সমাজের। অন্যদিকে গাছ ভূমিক্ষয় রোধের সঙ্গে প্রতিহত করে ঝড়কেও।

তাই শেষাবধি গাছ ও বিবাহকে একসূত্রে গাঁথলে অশুদ্ধ হয় না মহাভারত।

(লেখক প্রবন্ধকার)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

ঔদ্ধত্যেই কেরলে ধূলিসাৎ লাল নিশান

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী ১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসের এক ভ্যাপসা সকাল।...

চেনা ছক ভেঙে নতুন দিগন্ত তামিলনাডুতে

চিরঞ্জীব রায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা চিরাচরিত রাজনৈতিক...

অর্থনীতির সুস্থতায় চাই লক্ষ্যমুখী অনুদান

করদাতার টাকায় ঢালাও খয়রাতি নয়, প্রকল্পের সুফল পৌঁছাক প্রকৃত...

ইন্ডিয়া জোট-আকাশে আজও তীব্র আঁধার

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী ঐক্যের কথা বলছেন এতদিনে। পরাজয়ের পর।...