ইতিহাসের ধারায় সমন্বয় ও অভিযোজনের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে সভ্যতার সার্থক ও বলিষ্ঠ পরিচয়।
রাহুল দাস
পৃথিবীর একমাত্র শাশ্বত সত্য হল পরিবর্তন। সময়ের অমোঘ নিয়মে প্রকৃতি, সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি যেমন বিবর্তিত হয়, ঠিক তেমনই মানুষের চিন্তাভাবনা ও রুচিরও বদল ঘটে। তাই নির্দিষ্ট কোনও সংস্কৃতি চিরকাল একই জায়গায় স্থির থাকবে— এমন ধারণা আসলে ইতিহাসবিরোধী। ইতিহাস পর্যালোচনায় স্পষ্ট দেখা যায় যে, সংস্কৃতি কোনও স্থবির জলাধার নয় বরং এটি এক গতিশীল জলধারা। মানবসভ্যতার আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত যতগুলি মহান সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছে, তার প্রতিটির মূলে ছিল বিবর্তন। পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে নতুনের আবাহনই সংস্কৃতির প্রাণশক্তি। একে কোনও নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে রাখার চেষ্টা শেষপর্যন্ত তার স্বতঃস্ফূর্ততাকেই নষ্ট করে দেয়।
ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির বিবর্তনের ইতিহাস অতি প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময়। বৈদিক যুগের কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব, ইসলামি শাসন এবং মোগল আমলের আভিজাত্য—সবকিছুই এই ভূখণ্ডের জনজীবনে গভীর ছাপ রেখে গিয়েছে। পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা আমাদের জীবনদর্শনে নতুন মাত্রা যোগ করে। ভাষা, খাদ্য, পোশাক কিংবা সংগীত— প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুনের আগমন ও পুরোনোর রূপান্তর ঘটেছে। বাংলার সংস্কৃতির বুনটও ঠিক একইভাবে পারস্য প্রভাব, ইউরোপীয় আধুনিকতা এবং প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্যের সার্থক সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। এই বহুমাত্রিক পরিবর্তনের ছাপই আমাদের পরিচয়কে অনন্য করে তুলেছে।
অনেকে যে কোনও পরিবর্তনেই সংস্কৃতি ধ্বংসের ভয় পান, কিন্তু পরিবর্তন মানেই কেবল ক্ষয় নয়। পরিবর্তনের গর্ভেই জন্ম নেয় নতুন সাহিত্য, নতুন শিল্পরীতি ও নতুন সামাজিক মূল্যবোধ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিতে আমরা ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে পাশ্চাত্য মানবতাবাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে পাই। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে একদিকে যেমন গ্রামীণ বাংলার নিখুঁত বাস্তবতা ফুটে উঠেছে, তেমনই সেখানে অনুরণিত হয়েছে সমাজসংস্কারের আধুনিক চেতনা। আবার কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বহুসাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের সার্থক কারিগর। তাঁর লেখায় হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্যের এমন এক সংমিশ্রণ ঘটেছে যা বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যের গান গায়। এই মহৎ সৃষ্টিগুলোই প্রমাণ করে যে পরিবর্তনের পথ ধরেই সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
আসলে সংস্কৃতির এই যাত্রা কোনও একমুখী প্রক্রিয়া নয়। এটি গ্রহণ, বর্জন, অভিযোজন এবং পুনর্গঠনের একটি ধারাবাহিক পথ চলা। এই সমন্বয় না থাকলে সৃজনশীলতার নতুন নতুন সম্ভাবনা অকালেই বিনাশ হয়ে যেত। প্রতিটি পরিবর্তনের সময় হয়তো কিছু পুরোনো মূল্যবোধ বা প্রথা হারিয়ে যায়, কিন্তু সেই হারানোকে কেন্দ্র করে যদি আমরা সমস্ত পরিবর্তনকেই অস্বীকার করি, তবে ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিকেই রুদ্ধ করা হবে। সংস্কৃতি কখনও শূন্যে গড়ে ওঠে না; এটি ক্ষমতা, অর্থনীতি ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাই একে কেবল ‘অবক্ষয়’ বা ‘ভয়ংকর’ তকমা না দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন যে পরিবর্তনটি কতটা স্বতঃস্ফূর্ত এবং তা মানুষের স্বাধীনতাকে প্রসারিত করছে কি না।
রাজনৈতিক বাতাবরণ বা ক্ষমতার পট পরিবর্তনে সংস্কৃতির আমূল বদল ঘটবে বলে যারা শঙ্কিত, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে সংস্কৃতির পরিবর্তন অত্যন্ত ধীর এবং তা সময়ের চাহিদাতেই ঘটে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বা শাসন ব্যবস্থা জোর করে সংস্কৃতিকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারে না। সংস্কৃতি নিজেকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় এবং নতুনের মধ্যেই নিজের ভবিষ্যৎ পথ তৈরি করে। তাই সংস্কৃতিকে একটি স্থির সত্তা হিসেবে না দেখে তাকে একটি জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত। এই উদার ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিই বর্তমান সময়ের সবথেকে বড় প্রয়োজন যা আমাদের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে সাহায্য করবে।
(লেখক গৃহশিক্ষক ও অক্ষরকর্মী। তুফানগঞ্জের বাসিন্দা।)



