প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান: এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া চলার সময়ে ভোটার তালিকায় থাকা ‘ভূয়ো’ ছেলের (Fake son) কথা বারে বারে কমিশনকে জানিয়ে ছিলেন। তবুও সেই ‘ভূয়ো’ ছেলের কবল থেকে রেহাই পেলেন না পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর বিধানসভার জুতিহাটি গ্রামের বাসিন্দা অশোক অধিকারী! অভিযোগ, তাঁকে পিতা সাজিয়ে মনোতোষ অধিকারী নামে যে ব্যক্তি পূর্বে ভোটার তালিকায় নাম তুলে ছিলেন, সেই নাম এখনকার চূড়ান্ত ভোটার তালিকাতেও একই ভাবে ’অন্তর্ভূক্ত’ রয়ে গিয়েছে। বিধানসভা ভোটের মুখে এমন ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই এলাকায় পড়ে গিয়েছে তুমুল শোরগোল। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে কমিশন তাহলে ভোটার তালিকার কি ’সংশোধন’ করল, সেই প্রশ্নেই এখন সরব রাজ্যের শাসক শিবির।
জুতিহাটি গ্রামটি জামালপুরের আবুজহাটি ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার অন্তর্গত। ৪৪ বছর বয়সী অশোক অধিকারী এই গ্রামেরই বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, জুতিহাটি গ্রামে বসবাস করা মনতোষ অধিকারী তাঁর কেউ হয় না। অথচ সেই মনতোষই তাঁকে পিতা সাজিয়ে ভোটার তালিকায় নিজের নাম তুলিয়েছে। এমন কারচুপি করে মনতোষ কবে ভোটার তালিকায় তার নাম তুলিয়েছিল, সে বিষয়ে কিছুই জানতে পারেন নি অশোক বাবু। এসআইআর (SIR) পর্বে খসড়া তালিকা বের হওয়ার পর তিনি এই বিষয়টি জানতে পারেন।


অশোক অধিকারীর কথা অনুযায়ী, তাঁকে পিতা সাজিয়ে মনতোষ অধিকারী ভোটার তালিকায় নিজের নাম তুলিয়ে নিয়েছে দেখার পর তিনি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তিনি ছুটে যান তাঁদের বুথের বিএলও-র (BLO) কাছে। বিএলওকে তিনি জানান, “মনতোষ অধিকারীর পিতা তিনি নন। মনতোষের প্রকৃত পিতা হলেন পরমানন্দ অধিকারী। তিনি জুতিহাটি গ্রামের বাড়িতেই রয়েছেন। তবুও বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তাঁকে পিতা দেখিয়ে মনতোষ ভোটার তালিকায় নিজের নাম তুলিয়ে নিয়েছে বলে অশোক অধিকারী অভিযোগ করেন।
সংবাদ মাধ্যমকে অশোক অধিকারী জানিয়েছেন, বিএলওকে সব কিছু জানানোর পর বিএলও-র কথামতোই তিনি জামালপুর বিধানসভার নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান। তারপর কমিশনের ডাকা শুনানিতে হাজির হয়েও তথ্য প্রমাণ সহ মনতোষের গোটা কীর্তির কথা সবিস্তার জানান তিনি। কিন্তু এত সব কিছুর পরেও নাকি কমিশন মনতোষের নাম কাটার কোন পদক্ষেপই করে নি। চুড়ান্ত ভোটার তালিকাতেও মনতোষের পিতার নামের সংশোধন হয়নি বলে দাবি করেছেন অশোক অধিকারী।
উল্লেখ্য, জামালপুর বিধানসভার জুতিহাটি গ্রামের ১০৯ নম্বর বুথের ভোটার তালিকার পাতা উল্টালে এখন দেখা যাচ্ছে, ৬৪১ নম্বর সিরিয়ালে রয়েছে অশোক অধিকারীর নাম। আর ওই বুথেরই ৬৪৪ নম্বর সিরিয়ালে জ্বলজ্বল করছে ২৬ বছর বয়সী মনতোষ অধিকারীর নাম। এই চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় মনতোষের পিতা হিসাবে এখনও অশোক অধিকারীর নামই দেখাচ্ছে। যদিও এমনটা হওয়ার কারণ জানতে মনতোষের বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে মনতোষের দেখা পাওয়া যায় নি।
তিনি কর্মসূত্রে বাইরে থাকায় তাঁর বাবা পরমানন্দ অধিকারী ও মা কমলাদেবী সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হন। তাঁরা বলেন, “আমার ছেলের কোনও দোষ নেই। সবটাই কমিশনের ভুল। ভোটার লিস্টের সেই ভুল সংশোধনের জন্য আমার ছেলে অনেক বার বিডিও অফিসে দরবার করেছিল। কমিশনের ডাকা শুনানিতে হাজির হয়েও আমার ছেলে তাঁর পিতার নাম ভোটার তালিকায় ভুল থাকার কথা জানিয়ে আসে। ওই ভুল সংশোধন করে মনতোষ তাঁর প্রকৃত পিতার নাম ভোটার তালিকায় উল্লেখ করার আর্জিও শুনানিতে জানিয়ে এসেছিল। তার পরেও কমিশন যদি ভুল সংশোধন না করে তাহলে আমার ছেলে মনতোষের কি বা করার আছে।”
এই ঘটনা নিয়ে জামালপুর ব্লকের নির্বাচনী আধিকারিক তথা বিডিও পার্থসার্থী দে-কে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “কি হয়েছে আমি খোঁজ নেব।” ঘটনা প্রসঙ্গে জামালপুর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী ভূতনাথ মালিক বলেন, “ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে নির্বাচন কমিশন যে চুড়ান্ত ব্যর্থ তার বড় প্রমাণ এই ঘটনা।”
অপরদিকে, এই বিষয়ে জামালপুর ১ মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি প্রধানচন্দ্র পালের বক্তব্য, “অন্যকে বাবা সাজিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা চাই পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় এই রকম ঘটনা যত আছে সেই গুলি খুঁজে বার করে কমিশন কড়া ব্যবস্থা নিক।”

