ভাস্কর শর্মা, ফালাকাটা: গানের বিরতিতে অনেক শিল্পী তাঁর ‘সহযোদ্ধা’ মিউজিশিয়ানদের পরিচয় তুলে ধরেন দর্শকদের সামনে। মিউজিশিয়ানদের জন্যই তিনি পারফর্ম করতে পারছেন, এভাবে সহযোদ্ধাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দেন অনেক শিল্পী। ভোটের ময়দানেও প্রত্যেক প্রার্থীর সঙ্গে থাকেন এক একজন মিউজিশিয়ান। রাজনীতির ভাষার তাঁদের পরিচয় সেনাপতি হিসেবে। সেনাপতিরাই রণকৌশল নির্দিষ্ট করে পরিচালনা করেন প্রার্থীদের। জয়পরাজয়ের ক্ষেত্রে প্রধানত সেনাপতিদের ভূমিকা থাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফালাকাটা বিধানসভা কেন্দ্রে এই ভূমিকায় বিজেপির প্রশান্ত সরকার এবং তৃণমূলের রাজু মিশ্র। প্রশান্তর লড়াই দলীয় প্রার্থী দীপক বর্মনের জন্য এবং রাজু ঘাম ঝড়াচ্ছেন সুভাষচন্দ্র রায়ের হয়ে। লোকসভা, বিধানসভা এবং পঞ্চায়েত নির্বাচনের অতীত রেকর্ড ঘেঁটে রাজু ও প্রশান্ত তৈরি করছেন আগামীর রূপরেখা। বাম ও কংগ্রেসের অবশ্য সেভাবে ভোট ম্যানেজার নেই।
দীপকের প্রত্যাবর্তন ঘটবে, নাকি পরিবর্তন আনবেন সুভাষ, ভোটের হাতেগোনা কয়েকদিন আগে এমন চর্চাই ফালাকাটায়। বাম ও কংগ্রেসের ভোট প্রাপ্তি নিয়েও চর্চা রয়েছে। ওই দুই দলের ভোট কাটাকাটির ওপর ফলাফল অনেকটাই নির্ভরশীল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে দীপক এবং সুভাষ কিন্তু অনেকাংশেই নির্ভরশীল প্রশান্ত ও রাজুর ওপর। বিজেপি এবং তৃণমূলের হয়ে যাবতীয় ছক কষছেন তাঁরাই। এগিয়ে-পিছিয়ে হিসেব কষে, কোথায় কখন যেতে হবে প্রার্থীকে, কোথায় কত সময় থাকতে হবে, কী বলতে হবে, সমস্ত কিছুই ঠিক করছেন বিজেপি ও তৃণমূলের দুই সেনাপতি। প্রত্যেকটি শাখা সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া, -প্রদীপ ও রাজুর মোবাইল ফোন ব্যস্ত সাতদিন ২৪ ঘণ্টা। ভোট বাজারে প্রার্থীর পরেই তাঁদের জায়গা। ছায়াসঙ্গী হয়ে দুজনই থাকছেন দুই প্রার্থীর সঙ্গে।


পেশায় বিমাকর্মী প্রশান্তর বিজেপিতে যোগ ২০১৩ সালে। এখন বিজেপির টাউন মণ্ডলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে। ভোট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই দীপকের সঙ্গে তিনি। ব্যস্ততা বেড়েছে ভোট ঘোষণার পর। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত প্রায় ১২টা পর্যন্ত প্রার্থীর সঙ্গেই চক্কর কাটছেন। দীপকের সুবিধা-অসুবিধার পাশাপাশি নানা ঝামেলা মোকাবিলা করাও এখন তাঁর কাঁধে। দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করা, ভোটের কাজে লাগানো, নজর দিচ্ছেন সমস্ত কাজে। প্রশান্ত বলছেন, ‘দীপকবাবু আমাকে বিশ্বাস করে বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে এখন জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করছি। দলের প্রত্যেকের লড়াইয়ে সাফল্য আসবে বলেই আমারও দৃঢ় বিশ্বাস।’
তৃণমূল কংগ্রেসের ফালাকাটা টাউন ব্লকের দায়িত্বে থাকা রাজুও দিনরাত এক করছেন সুভাষের হয়ে। সমস্ত খবরাখবর রাখতে পার্টি অফিসে খুলেছেন কন্ট্রোল রুম। প্রয়োজন মতো বিভিন্ন নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি প্রার্থীর সঙ্গে চক্কর কাটছেন শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডের আনাচেকানাচে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের দলীয় সমর্থক মহিলাদের এক জায়গায় নিয়ে আসার কাজও করছেন। সুভাষের ভোট কান্ডারি রাজুর কথায়, ‘আমরা একটি টিম হিসেবে প্রার্থীকে জেতাতে কাজ করছি। প্রতিটি ওয়ার্ডের সদস্যরা আসছেন। আমাদের বিশ্বাস পরিশ্রম স্বার্থক হবেই এবার।’
ভোট কৌশলীরা শুধু যে রণকৌশল ঠিক করার পাশাপাশি প্রার্থীর প্রচার সূচি নির্ধারণ করছেন তা নয়, প্রার্থীদের খাবার, শরীরের ভালোমন্দের দিকেও নজর রয়েছে তাঁদের। কোথাও প্রচারে বাধা সৃষ্টি হলে, সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা থাকছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সমান দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে প্রতিপক্ষের রণকৌশলের দিকেও। প্রতিপক্ষের পদক্ষেপ মেপে পালটা পদক্ষেপ করার ক্ষেত্রেও সেনাপতিদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ফলে ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ততা বাড়ছে প্রশান্ত ও রাজুর। নির্বাচন কমিশনের তথ্যে হয়তো প্রার্থীদের নামের পাশে জয়ী অথবা পরাজিত লেখা থাকবে, কিন্তু বাস্তবে জয়-পরাজয়ের ভাগিদার ভোট ম্যানেজাররা। প্রার্থী জয়ী হলে তাঁর কদর বাড়বে, সামনে থাকবে উত্থানের সিঁড়ি, পরাজয়ে দায় পড়বে কাঁধে। তাই কিছুটা হলেও সাবধানী দুই শিবিরের দুই সেনাপতি।

