সুভাষ বর্মন, ফালাকাটা: সময় বয়ে চলে, সমস্যা মেটে না। ফালাকাটা-সলসলাবাড়ি নির্মীয়মাণ মহাসড়ক (Falakata-Salsalabari Highway) নিয়ে একাধিক জটিলতা এখনও রয়েছে। ফালাকাটার রাইচেঙ্গায় জমির ন্যায্যমূল্য পাননি বলে চার বছর ধরে বাসিন্দারা আন্দোলন করছেন। আদালতে মামলাও চলছে। আসাম মোড়ে একটি সর্বজনীন মন্দির কমিটিও জমির মূল্য পায়নি। এরকম নানা সমস্যায় মহাসড়ক জর্জরিত। জট না কাটায় সেসব জায়গায় কাজও থমকে। কিন্তু এই সমস্যা কবে মিটবে, তার কোনও উত্তর নেই। আর ক’দিন পরেই ভোট। সমস্ত রাজনৈতিক দল দাপিয়ে প্রচার করছে। অথচ মহাসড়কের সমস্যা নিয়ে কারও কোনও উচ্চবাচ্য নেই। ভোটের প্রচারেও মহাসড়কের ভোগান্তির কথা নেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে না। ভারী বৃষ্টি হলে জলকাদায় মানুষ এখনই ভোগান্তিতে পড়ছে। ভোট পার হলে এই সমস্যা যে আরও বাড়বে তা নিশ্চিত।
২০২২ সালে রাইচেঙ্গার ৫৩ জন বাসিন্দা ন্যায্যমূল্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এজন্য ওই বছরেই তাঁরা হাইকোর্টে একটি মামলাও করেন। সেই জটিলতা এখনও কাটেনি। গত বছর দু’-তিনবার সেখানে রাস্তার কাজ শুরু করতে গেলে বাধার মুখে পড়ে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষকে (এনএইচএআই)–কে সরে আসতে হয়। ভোটের আগে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চয়ই রাজনৈতিক নেতারা এগিয়ে আসবেন বলে আন্দোলনকারীরা ভেবেছিলেন। কিন্তু কোনও দলেরই কেউ এ নিয়ে কোনও কথা বলেননি। আন্দোলনকারী নন্দ ঘোষের কথায়, ‘বারবারই আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আন্দোলন বন্ধ হয়নি। কিন্তু ভোটের আগে কেউ আমাদের সঙ্গে দেখা করেনি। এই বিষয়টি নিয়ে নেতাদের কোনও মাথাব্যথাও নেই।’ মাস দুয়েক আগে আসাম মোড়ে রাস্তার কাজ শুরু করতে গেলেও বাধা আসে। সেখানে সর্বজনীন মন্দির কমিটি এখনও জমির মূল্য পায়নি। তাই সেখানেও কাজ থমকে। কমিটির প্রতিনিধি মিঠুন বর্মনের কথায়, ‘ক্ষতিপূরণ না পেলে মন্দির ভাঙা হবে না। কাজও শুরু করতে দেওয়া হবে না।’ এরকম জট আরও বিভিন্ন জায়গায় আছে।


এছাড়া বৃষ্টি হলে তো মহাসড়কে ভোগান্তিই বড় সমস্যা। এক মাস আগে টানা ক’দিনের বৃষ্টিতে চরতোর্ষা ডাইভারশনে ভাঙন শুরু হয়। এখানে জোড়া পাকা সেতুর কাজ এখনও শেষ হয়নি। বর্ষায় এই ডাইভারশন ভাঙলে সড়কপথে ফালাকাটা-আলিপুরদুয়ারের মধ্যে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফালাকাটা থানার পুলিশ দোলং নদীর উপর দুর্বল কাঠের সেতু দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বেশি বৃষ্টি হলে সেখানে হিউমপাইপের ডাইভারশনের উপর দিয়ে জল বয়ে যায়। গতবার গিরিয়া ডাইভারশন ভেঙেছিল। এখানেও পাকা সেতুর কাজ শেষ হয়নি। গত এক বছরে শুধু বুড়িতোর্ষা নদীর উপর দুটি সেতু ও সনজয় নদীর উপর একটি সেতু তৈরি হয়েছে। এছাড়াও রাস্তার খানাখন্দ তো আছেই। এবারও যে ভোটের পর এই রাস্তায় সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তি অপেক্ষা করছে তা স্পষ্ট। যদিও ভোটের কারণে সড়ক কর্তৃপক্ষ বেশি কিছু বলতে চাইছে না। মহাসড়কের ফালাকাটার সাইট ইঞ্জিনিয়ার নকুল রাভা শুধু বললেন, ‘যেখানে সমস্যা নেই সেখানে রাস্তা ও সেতুর কাজ চলছে। বৃষ্টির জন্য কোথাও রাস্তার ক্ষতি হলে ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে।’
এই রুটের বাসচালক শিশাগোড়ের কালা সরকার বলছিলেন, ‘বৃষ্টি হলেই ভয়ে ভয়ে এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। কবে যে ঝাঁ চকচকে মহাসড়ক পাব তা এখনও বোঝাই যাচ্ছে না।’ কালীপুরের ব্যবসায়ী বিষ্ণুপদ সরকার রোজ বাইকে যাতায়াত করেন। তাঁর কথায়, ‘বৃষ্টি হলে জল, কাদা ছিটকে আসে। আর রোদ উঠলে ধুলোয় নাজেহাল হতে হয়৷’ কিন্তু এত বড় একটি রাস্তা এবার ভোটের ইস্যু থেকে বাদ গেল কেন? মহাসড়ক তো কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প। কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় বিজেপি এটাকে প্রচারে তুলে ধরতে পারছে না। আবার স্থানীয় স্তরে নানা জটিলতার নেপথ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল। তাই মহাসড়ক নিয়ে স্পিকটি নট দুই ফুলই।
যদিও বিজেপির জেলা সভাপতি মিঠু দাস বলছেন, ‘মহাসড়কের কাজ এখন অনেকটাই দ্রুত এগোচ্ছে। আর এই রাস্তার দীর্ঘসূত্রিতার পেছনে এক সময় তৃণমূলের নেতারাই দায়ী ছিলেন। তৃণমূলের কাটমানির জেরেই আগের কোম্পানি কাজ ছেড়ে চলে যায়।’ এদিকে তৃণমূলের জেলা সাধারণ সম্পাদক তথা ফালাকাটার প্রার্থী সুভাষচন্দ্র রায়ের বক্তব্য, ‘মহাসড়ক মহাদুর্ভোগের কারণ। এজন্য বিজেপিই দায়ী৷ কেন্দ্রের প্রকল্প। এখানে তৃণমূলের তো কোনও ব্যাপার নেই। আর ভোগান্তির কথা দলের স্থানীয় নেতারা প্রচারে তুলে ধরছেন।’

