বালুরঘাট ও হিলি: চার চাকা গাড়ি কিনে দিতে হবে। এমনই বায়না ধরেছিল ছেলে। কিন্তু ছেলের সেই বায়না মেটাতে পারেননি বাবা। আর সেই অভিমানেই বাড়ির ছাদ থেকে ছেলের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করল পুলিশ। শুক্রবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে হিলি থানার ত্রিমোহিনী এলাকার কিসমতদাপট গ্রামে। পুলিশ জানায়, মৃতের নাম সুদীপ্ত চক্রবর্তী (২২)। স্থানীয় হিলি গভর্নমেন্ট আইটিআইয়ের প্রাক্তন ছাত্র।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরেই বাবা-মায়ের কাছে নতুন চার চাকা গাড়ির আবদার করছিলেন সুদীপ্ত। বাড়ির পুরোনো গাড়িটি সুদীপ্তই চালাতেন। তবে সুদীপ্তর নতুন গাড়ি কেনার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। শুক্রবার বাবাকে নিয়ে নতুন গাড়ি কিনতেও গিয়েছিলেন বলে পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের খালি হাতেই ফিরে আসতে হয়। মূল কারণ অর্থের অভাব। নতুন গাড়ি কেনার মতো অর্থ তাঁর বাবা জোগাড় করতে পারেননি। সেই কারণে গাড়ি না নিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে বাকবিতণ্ডা বাধে সুদীপ্তর। সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরার পর গাড়ির কথা তুলতেই বাবা-মা তাঁকে বোঝান, টাকা জোগাড় করে কয়েকদিনের মধ্যেই গাড়ি কিনে দেবেন। কিন্তু ততক্ষণে অভিমান চেপে বসে বলে মনে করছেন পরিবার ও প্রতিবেশীরা। সন্ধ্যার পর সুদীপ্তর বাবা, মা দুজনেই বাইরে বেরিয়েছিলেন। সেই সুযোগেই সুদীপ্ত বাড়ির ছাদে গিয়ে গলায় ফাঁস দেন বলে পরিবারের লোকজনের অনুমান।
সুদীপ্তর পিসতুতো ভাই আনন্দ মহন্ত বলেন, ‘বাবা-মা গাড়ি কিনতে রাজি ছিলেন। শুধু সময় চাইছিলেন। কিন্তু ভাইয়ের মনে যেন তাড়াহুড়ো ছিল। অভিমানেই ও এমন পদক্ষেপ করল।’ মৃতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রিন্টু বর্মনের কথায়, ‘শুক্রবার গাড়ি কিনতে গিয়ে ফেরার পথে বাবা-ছেলের মধ্যে ঝামেলা হয়। বাড়ি ফিরে বাবা কাজে বাইরে চলে যান। ওর মাকে তাঁর কাজের জায়গা মহিষনোটা গ্রামে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসে অনেক ডাকাডাকি করেও ওর সাড়া পাইনি। শেষে ছাদে উঠে দেখি ও ঝুলছে। আমরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।’ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা সুদীপ্তকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। শনিবার বালুরঘাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। তবে পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। সুদীপ্তর বাবা সুব্রত চক্রবর্তী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিকটকালী মন্দিরে রোজ দু’বেলা পুজো করতেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে অসুস্থ থাকায় সুদীপ্তই সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। দায়িত্ববান পুরোহিত-পুত্র হিসেব যিনি মন্দিরের পুজো সামলাতেন, সেই তরুণের এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছে না গোটা গ্রাম।
এই আত্মঘাতী প্রবণতার পিছনে সামাজিক কারণকেই দায়ী করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। বালুরঘাটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ঋতব্রত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সামাজিক ভোগবাদ নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সাইকলজিক্যাল পরিবর্তন আনছে। কিছু পেতে গেলে কষ্ট করা, তার জন্য অপেক্ষা করা ও নিজের যোগ্যতা তৈরি না করে চাইলেই পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। তৎক্ষণাৎ সেটা না পেলে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এমনকি বাবা-মায়ের বকুনি বা সামান্য কোনও বিষয়েও তারা ভেঙে পড়ছে।’

