রূপায়ণ ভট্টাচার্য
মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ…!
রাজাকার, রাজাকার, রাজাকার…!
বাংলাদেশের (Bangladesh) পুরো নির্বাচনজুড়ে এই দুটি শব্দ সবচেয়ে বেশি বার যিনি উচ্চারণ করে গিয়েছেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান (Fazlur Rahman)। বিএনপি (BNP) নেতা। বাংলাদেশে যদি সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক আবেগময় ভাষণ দেওয়ার লোক খোঁজার চেষ্টা করা যায়, তাহলে তিনি এই আশি ছুঁইছুঁই আইনজীবী। যাঁর কথা শুনলে কখনও দু’চোখ জলে ভরে ওঠে, কখনও রক্তে দোলা লাগে। নিজের উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না তখন।
সারা বাংলাদেশে যখন মুজিবুর রহমানের (Sheikh Mujibur Rahman) মূর্তি ভাঙা হচ্ছে, বাড়ি ভাঙা হচ্ছে তখন এই বিএনপি নেতাই বারবার বলে গিয়েছেন, এটা অন্যায়, ঘোরতর অন্যায়। ওই লোকগুলোর শাস্তি প্রাপ্য। সাফ বলেছিলেন, এই গণ অভ্যুত্থান কালো শক্তির আন্দোলন। যার পিছনে জামায়াতে। কিন্তু অসহায়, কিছু করতে পারেননি। কারণ মসনদে তখন মৌলবাদীদের হাতে বন্দি শাজাহান ইউনূস। তাঁর নিজের পার্টি বিএনপিও ছন্নছাড়া। তাঁকে তিন মাসের জন্য সব পদ থেকে থেকে সরিয়ে দেয় বিএনপি।
নির্বাচনের হাওয়ায় যখন বাংলাদেশের হিন্দুরা চরম দিশেহারা, ফজলুর তখন অনেক গ্রামে গিয়ে আবৃত্তি করেন রবীন্দ্রনাথ, আবৃত্তি করেন মাইকেল মধুসূদন। এই বয়সেও তিনি পুরো কবিতা বলতে থাকেন। শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই অথবা রেখো মা দাসেরে মনে এ মিনতি করি পদে।
বলার সময় তাঁর চোখমুখ পালটে যায়। মৌলবাদী জামায়াতের অনেকে তাঁকে বিদ্রুপ করে ফজলু পাগলা বলেন। তাতে কিছু এসে যায় না তাঁর। হিন্দু মহল্লায় গিয়ে তিনি এবার বলেছেন হিন্দুরা একটা হাত হলে মুসলিমরাও আরেকটা হাত। আমাদের দুই হাত নিয়ে চলতে হবে। তিনি দ্বিধাহীন বলে যেতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধ তাঁর অহংকার, মুক্তিযুদ্ধ একমাত্র পরিচয়। বঙ্গবন্ধুই জাতির পিতা।
মাঝে এমন পরিস্থিতি হল, মনে হচ্ছিল, মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু হয়নি। আচমকা একদল লোক বলতে শুরু করল, মুক্তিযুদ্ধই ভারতের স্টান্টবাজি। এই সময় ফজলুর বিএনপিতে থেকেও কাঁদতে কাঁদতে বলে গিয়েছেন, মুজিবের ধানমন্ডি ৩২ নাই, তবু মুজিব বেঁচে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। যতদিন এই বাংলায় চন্দ্র-সূর্য উঠবে, যতদিন আমার পরবর্তী প্রজন্ম থাকবে, যতদিন এই বাংলায় পদ্মা মেঘনা যমুনা বইবে, কেউ মুক্তিযুদ্ধকে ধ্বংস করতে পারবে না।
সবচেয়ে বেশি ভোটে জেতা ফজলুরকে দেখে মনে হয়, এই বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে হলেও শত্রু এলে অস্ত্র হাতে লড়তে জানে। প্রতিবাদ করতে জানে। অত সহজে মৌলবাদীদের হাতে দেশকে তুলে দেবেন না। লক্ষ মানুষের রক্ত ঝরানো এরকম ফজলুর অনেক রয়েছেন। যাঁরা এতদিন গুটিয়ে ছিলেন, তাঁরা আবার বেরিয়ে আসছেন রাস্তায়। যে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটার ভোট দিলেন না, তাঁরাও যেন নীরব প্রতিবাদ করে গেলেন ভোট বয়কটের মাধ্যমে। এর চেয়ে বড় নীরব প্রতিবাদ হতে পারে না কিছু। শেখ মুজিবকে যেভাবে অপমান করা হয়েছে তা আমরা মানতে পারছি না।
এই ভোটের পর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বা শেখ মুজিবুর রহমানকে আর উপেক্ষা করা যাবে না। আর বিশ্রীভাবেও অপমান করাও যাবে না। ফজলুর যেমন সভায় বলতেন, ‘হাসিনার বিরুদ্ধে অবশ্যই বলব। হাসিনার দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও বলব। কিন্তু শেখ মুজিবুরের বিরুদ্ধে একটা কথাও শুনব না।’
টলমল ইউনূস জামায়াতের দিকে ঢলে থাকা এক পরজীবী। মুজিবের শত অপমানের পরেও চুপটি করে বসে ছিলেন। এবার আর অত সহজ হবে না ব্যাপারটা।
আবার সংশয়ও থাকে একটা। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতে জোট ভোটে জিতে তাদের জয়োৎসব পালন করেছিল হিন্দুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে। বাংলাদেশের সব থানায় দুর্গা প্রতিমা ভাঙা হয়েছিল। হিন্দুরা সেই দুঃসময় ভোলেননি পঁচিশ বছর পরেও। সংশয় থাকবে না? ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিন্তু তাঁর নির্বাচনি ইস্তাহারে সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করার মতো কোনও কথা রাখেননি। সংশয় থাকবে না?
ফজলুর ছাড়া আরেকজনের কথা বলতে হবে যিনি বিএনপিতে থেকেও মুজিবুরের কৃতিত্বের কথা বলে বেরিয়েছেন। লিগের নির্যাতিত সমর্থক, কর্মীদের হয়ে কথা বলেছেন। লিগকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। সাহসের সঙ্গে, দাপটের সঙ্গে। বিএনপির অনৈতিক কাজ নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। বিএনপি তাঁকে একসময় বহিষ্কার করেছে। অথচ তিনি নিজেই স্বতন্ত্র পার্টির হয়ে নেমে ভোটে জিতেছেন স্বচ্ছন্দে। তিনিও এক প্রতিবাদী জোয়ার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
এমন দু’-তিনজন আজও আছেন বলেই আজও আশ্বাস ছড়ায় বিএনপি।
এবং এইসব জোয়ারের কাছে ভেসে যেতে বাধ্য দেশকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া মৌলবাদ। ভোটটা জিতেছে বিএনপি, আসলে জিতেছে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং স্বাধীনতার যুদ্ধ। যার জন্য বাংলাদেশকে শ্রদ্ধা করত বাকি বিশ্ব। জামায়াতে নেতারা জুলাইয়ের ছন্নছাড়া রক্তাক্ত হামলাকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে চালাতে চাইছিলেন। আশা করা যাক এবার সেই অশেষ মূর্খামির শেষ হবে। ফজলুর বলেছেন, ‘বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ নাম যদি থাকে, জামায়াতে জীবনে কোনওদিন আল্লার রহমতে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। কোনওদিন না।’
মজা হল, বাংলাদেশকে মৌলবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য যে জনাতিনেক ইউটিউবার বিদেশ থেকে মিথ্যে এবং উত্তেজক কথা বলে বেরিয়েছে, সেই পিনাকী ভট্টাচার্য বা ইলিয়াস হোসেনরা এখনও নিশ্চুপ নয়। লজ্জাহীন। তাই এখনও বড় বড় কথা বলে যাচ্ছে। তারেক রহমান সরকারের উচিত, ক্ষমতায় এসেই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। আর কতদিন অকথ্য মিথ্যে বলে দেশবাসীকে উত্তেজিত করবে তারা?
এই নির্বাচনের ফলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছিল বাংলাদেশের নারীদের ভাগ্য। জামায়াতে জোট জিতলে তাঁদের অধিকাংশকেই বাড়িতে বসে থাকতে হত বোরখা বা হিজাব পরে।
ঢাকার এক নায়িকা ভোটগণনার আগে বলেছিলেন, ‘পয়লা ফাল্গুনের অনুষ্ঠানে শাড়ি পরতে পারব, না বোরখা পরতে হবে, তা ঠিক হবে আজ।’ বিএনপির জয়ে অবশ্যই তিনি স্বস্তিতে। স্বস্তিতে তাঁর মতো আরও কয়েক লক্ষ বাঙালি নারী। তবে সবচেয়ে অবাক করা কাণ্ড, এই বাজারেও জামায়াতের পক্ষে এখনও কিছু মহিলা রয়েছেন। যাঁরা বোরখা পরে মিছিলে হাঁটেন। ভোটের পাঁচদিন আগেই তসলিমা নাসরিন একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায়, কয়েকশো মহিলা বোরখা পরে জামায়াতের মিছিলে।
ভাবতে অবাক লাগে, হাসিনা-খালেদার দেশে সংসদে এবার মাত্র ৭ জন নারী। এবং এটাই নাকি অনেক। এঁরা নির্বাচিত ফরিদপুর (২), সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝালকাঠি, নাটোর, মানিকগঞ্জ থেকে। তার মানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনার মতো বড় শহরে নারী নেত্রীরা উপেক্ষিত।
আরও অস্বস্তির, ঢাকার মতো প্রাণোচ্ছল ও মুক্তচিন্তার শহরে কুড়ির মধ্যে ৭টি আসনে জামায়াতে জোটের প্রার্থীর জয়। এই শহরই মুজিবের বাড়ি ও মূর্তি ধ্বংস হতে দেখেছিল না? তবু ওরা জেতে কী করে! ৬ ধান্দাবাজ ছাত্র নেতা জামায়াতের কাঁধে ভর দিয়ে জিতেছেন দল একেবারে পদ্মায় ডুবে গেলেও।
অস্বস্তি নম্বর দুই, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত লাগোয়া বাংলাদেশি এলাকায় জামায়াতের জয়গান। এপারে মৌলবাদের ঝনঝনানি দেখে ওপারও মৌলবাদের রক্তাক্ত অস্ত্র বেছে নিচ্ছে। অথবা উলটোটা। ওপারের লোক বিষ পান করছে দেখে এপারের লোকও বিষ পান করবে তা হলে! তিনবিঘার লাগোয়া এলাকায় উগ্র মৌলবাদকেই বেছে নিয়েছে ওপার বাংলার মানুষ।
এর শেষ কোথায়?
শেষ আছে, আলো আছে শুরুতেই। গোটা বাংলাদেশ তো বিদ্বেষ, বিস্ফোরণের মাঝে দাঁড়িয়ে উগ্র মৌলবাদকে শেষপর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা পশ্চিমবঙ্গের কাছে শিক্ষা।
আমাদের বাংলাতেও কিছু ফজলুর রহমান এবং রুমিন ফারহানার মতো স্পষ্ট বক্তা, আবেগপ্রবণ নেতা দরকার। যাঁরা পার্টির ভুল নীতির ঊর্ধ্বে উঠে সহজ সত্য ন্যায্য কথাটা বলতে পারবেন। বক্তৃতা দিয়ে কাঁদাতে পারবেন মানুষকে, আগুন জ্বালাতে পারবেন হৃদয়ে!

