হরষিত সিংহ, মালদা: প্রেম ভাঙতে রীতিমতো সালিশি সভা বসিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হল। আর তা করা হল তৃণমূল পঞ্চায়েত সমিতি সদস্যার স্বামীর ইন্ধনে। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল ছড়িয়েছে ইংরেজবাজার ব্লকের যদুপুর-২ পঞ্চায়েতের একটি গ্রামে।
পঞ্চায়েত সদস্যর নাবালিকা মেয়ে এলাকারই এক নাবালকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি তারা পরিবারকে না জানিয়ে বিয়েও করে নেয়। কিন্তু সেই সম্পর্ক মানতে চাননি নাবালিকার মা-বাবা। নাবালিকার মা আবার শাসকদলের পঞ্চায়েত সদস্য। আর বাবা স্থানীয় তৃণমূল নেতা। তাঁরাই সালিশি সভা বসিয়ে ওই নাবালকের বাবাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জরিমানার টাকা না দিলে বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। প্রাণভয়ে সেই টাকা মিটিয়ে দেয় ছেলের পরিবার। অভিযোগ, তারপরও থানায় নাবালকের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য। এই ঘটনায় নাবালক ও নাবালিকাকে হোমে পাঠিয়েছে পুলিশ।


নাবালকের পরিবারের দাবি, গত ৬ মাস আগে ওই নাবালক ও নাবালিকা পরিবারের অজান্তে বিয়ে করে। বিয়ের পর কিছুদিন ছেলের বাড়িতেই ছিল ওই নাবালিকা। কিন্তু তাদের বাড়ি থেকে ওই নাবালিকাকে নিয়ে আসেন নাবালিকার পরিবারের লোকেরা। বিয়ের কথা জানার পর থেকেই নাবালকের পরিবারকে হুমকির মুখে পড়তে হয়। তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভাঙতে গ্রামেই সালিশি সভা বসান স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যা ডলি মণ্ডলের স্বামী উত্তম মণ্ডল। মেয়ের মা ঊষা মণ্ডলের কথাতেই একাজ করেন উত্তম। অভিযোগ, তাঁর মদতেই গ্রামের মোড়ল ৫০ হাজার টাকা জরিমানার নিদান দেন। সিদ্ধান্ত হয়, নাবালিকার বাবাকে সেই টাকা দিতে হবে। সেইমতো টাকা দিয়েও দেন নাবালকের বাবা। কিন্তু তাতেও রেহাই মেলেনি বলে অভিযোগ।
ছেলের ঠাকুমা বলেন, ‘সালিশি সভায় একতরফা বিচার হয়। টাকা না দিলে বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আমরা ভয়ে গত এক সপ্তাহ আগে মেয়ের বাড়ির লোকজনের হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দিই। তারপরও আমাদের ছেলেকে মিথ্যা কেস দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছে মেয়ের মা।’ যদিও অভিযুক্ত পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যার স্বামী উত্তম মণ্ডলের বক্তব্য, ‘সালিশি সভা হলেও আমরা কোনও টাকা ছেলের পরিবারের কাছ থেকে নিইনি।’
এদিকে, সালিশির কথা স্বীকার করলেও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন ওইদিনের সালিশি সভার সভাপতি তথা মোড়ল মাধব কুণ্ডু। তিনি বলেন, ‘সালিশি হয়েছে। তবে কোনও টাকা নেওয়া হয়নি। ওঁদের ভয় দেখানোর জন্য টাকার কথা বলা হয়েছিল।’
তবে ওইদিনের সালিশি সভার চুক্তিপত্রে জ্বলজ্বল করে লেখা রয়েছে, ৫০ হাজার টাকা জরিমানার কথা। এমনকি টাকা দেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে সেখানে। তার নীচে স্বাক্ষর রয়েছে অনেকেরই। এ বিষয়ে স্থানীয় তৃণমূল নেতা উত্তম মণ্ডল বলেন, ‘সালিশি হয়েছে। তবে আমি বেশিক্ষণ ছিলাম না। কী সিদ্ধান্ত হয়েছে আমার জানা নেই।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, যদুপুর ২ নম্বর পঞ্চায়েতের ওই গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্যার মেয়ের সঙ্গে গ্রামেরই এক নাবালকের প্রেম হয়। তারপর তারা বিয়ে করে। তা নিয়েই দুই পরিবারের মধ্যে বিবাদ বাধে। ছয় মাস আগে তারা বিয়ে করে। মাঝে ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে পঞ্চায়েত সদস্য তাঁর মেয়েকে নিজের বাড়ি নিয়ে চলে যান।
স্থানীয় তৃণমূল নেতার মদতেই গত ২৯ জুলাই রাতে গ্রামে সালিশি সভা হয়। সেখানেই ছেলের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত হয়। ৬ অগাস্টের মধ্যে টাকা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় বিচারে। ছেলের বাড়ির দাবি, ভয়ে তাঁরা টাকা সাতদিন আগেই দিয়ে দেন। তারপর মেয়ে আবার নিজে থেকেই ছেলের বাড়ি চলে আসে। তারপরই মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। পুলিশ তারপর ছেলে ও মেয়েকে উদ্ধার করে হোমে পাঠায়। জেলা পুলিশ সুপার প্রদীপকুমার যাদব বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে।’
গত ২৭ অগাস্ট গভীর রাতে মেয়ে নিজের বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। অভিযোগ ছেলেমেয়ে একসঙ্গেই পালিয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনার পরেই সালিশি সভার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এতদিন ছেলের বাড়ির লোকেরা বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেননি। গত বুধবার মেয়েটি ও ছেলেটি বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। তারপর পুলিশ ছেলেমেয়েকে আটক করতেই ছেলের পরিবারের লোকেরা বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই নিন্দার ঝড় উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে। বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেনারেল সেক্রেটারি নীলাঞ্জন দাস বলেন, ‘রাজ্যজুড়ে তৃণমূলের দাদাগিরি চলছে। এটি তৃণমূলের নতুন চাকরি। সালিশি সভা করে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা রোজগার করছেন। সেই টাকা কিছু নিজের কাছে রাখছেন। কিছু উপরতলার নেতাদের কাছে পাঠাচ্ছেন। এভাবেই চলছে দল।’ তবে এ বিষয়ে জেলা তৃণমূলের মুখপাত্র আশিস কুণ্ডু বলেন, ‘পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে। যদি কেউ দোষী থাকেন, পুলিশ তার ব্যবস্থা নেবে।’

