সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি: গরিব ঘরের মেয়ে মিনতি। আর বড়লোক ঘরের ছেলে অমর বাউদিয়া। পরিবার মানেনি তাঁদের সম্পর্ক। বাড়ির অমতে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা লুকিয়ে। কিন্তু মিনতি তো খালি মিনতি নয়। মিনতি সরি। খনপালার (Khan Pala Gaan) অভিধানে ‘সরি’ মানে যে মহিলা সংসার করতে চায়, কিন্তু শেষপর্যন্ত হার মানে পরিস্থিতির কাছে। মিনতি-অমরের পরিণতিও তাই বিয়োগান্তক।
বারুলিয়া মোড়ের ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে খদ্দেরের গ্লাসে চিনি গুলতে গুলতে সুরেশের ঘাড়ে মিনতি এসে ভর করে। চোখের পাতা ঘনঘন পড়তে থাকে। হাত দুটো ঈষৎ এলানো। যেন তাতে গলানো রয়েছে অদৃশ্য শাঁখা-পলা। চায়ের কেটলি, দোকানের চালা, ফুটতে থাকা জল- আস্তে আস্তে মুছে যায়। পালার কথা উঠলেই তাঁর চোখের সামনে যেন দেখতে না পাওয়া দর্শকদের ভিড়।
কম দিন তো হল না। ক্লাস ফোর পাশ করে বাবা উৎসাহ দিয়েছিলেন পালাগানের জগতে যাওয়ার জন্য। সেই শুরু। বাড়িতে তখন অর্থাভাব। প্রথমদিকে ছোকরা হিসেবে নৃত্য দলের সঙ্গে মঞ্চে নামা। আসর করে সুরেশচন্দ্র দেবশর্মা তখন পেতেন ১ টাকা। এরপর পেরিয়ে গিয়েছে ৫৫ বছর। ছোকরা থেকে ‘মিনতি সরি অমর বাউদিয়া’ পালায় মূল নারীচরিত্রে অভিনয়। দর্শকের মনে ধরে যাওয়ায় আর ফিরে তাকাতে হয়নি। কুমারী মেয়ে থেকে মহিলার চরিত্রে অভিনয় করতে করতে জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে তার সুরেশ দেবশর্মার বাস্তব চরিত্রটাই। মন-মানসিকতা, শারীরিক ভাষা, কথা বলার ভাবভঙ্গি- সবেতেই অঙ্গাঙ্গীকভাবে জড়িয়ে গিয়েছে নারীভাব। একসময় সুরেশের ওপর চেপে বসেছে মিনতি। নিজে পুরুষ, কিন্তু আর কোনও মহিলাকে জড়িয়ে সংসারও করতে পারেননি।
শ্রীমতী নদীর পশ্চিমপাড়ে কিছুটা এগিয়ে গেলেই দিলালপুর গ্রাম। গ্রামের বারুলিয়া মোড়ের ছোট্ট একটি চায়ের দোকান রয়েছে সুরেশের। দিনাজপুরের লোকনাট্য খন পালাগানের জগতে সুরেশচন্দ্র দেবশর্মাকে চেনেন না, এমন শিল্পী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ ব্লকের দিলালপুর গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সুরেশ একসময় হয়ে উঠেছিলেন মিনতি, কখনও বা বড় দেউনিয়ানী (বড় বৌ)। আর ভালোবেসে ফেলেছিলেন সেই নারীসত্ত্বাকেই। শুধু খন পালাগান নয়, লোকনাট্য সত্যপির, বিষহরা, রাম বনবাস পালাতেও তিনি ছিলেন দক্ষ অভিনেত্রী। তবে অকপটে বলেন, ‘মিনতি সরি পালায় মিনতির চরিত্রটাই আমার জীবনের সেরা চরিত্র।’
যে চরিত্র তাঁর সত্ত্বাটাকেই বদলে দিল, তাতে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াটাও হঠাৎ করেই। মিনতিকে ঘিরে ছোকরারা নাচ করত। তাদের মধ্যে সুরেশও ছিলেন। একদিন মূল অভিনেত্রীর অনুপস্থিতিতে সুযোগ মিলে যায়। আজও সেই দিনটার কথা ভোলেননি। বলছিলেন, ‘মিনতি চরিত্রে অভিনয়ের ডাক পেয়ে একটাই কথা মনে হয়েছিল। তাহলে আর আমাকে ছোকরা নাচতে হবে না।’
তারপর থেকে আজ অবধি ২৫০টির বেশি আসর করেছেন। সারারাতের আসর করে ইদানীং দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পান। তবে নায়িকার চরিত্রে অভিনয়ের যে পরিশ্রম, তাতে এখন আর অনুমতি দেয় না শরীর। এখনও সত্যপির কিংবা বিষহরা পালায় ছোকরা হিসেবে মঞ্চে দাঁড়ালে অবাক হয়ে যান দর্শকরা। মঞ্চের বেশভূষার আড়ালে পরিচিতরাও খুঁজতে থাকেন চেনা সেই সুরেশ দেবশর্মাকে। আর নারীচরিত্রের পোশাকে সেজে দাঁড়ালে তিনি তখন পুরোপুরি নারীই।
সুরেশ বলছিলেন, ‘বাড়ি থেকে দলের সঙ্গে বেরিয়ে ফিরতাম এক মাস বাদে। কীভাবে ভালোবেসে ফেললাম খন পালাগানকে, জানি না। যতদিন শরীর চলবে ততদিন এই ভালোবাসা থেকে বিচ্ছেদের কোনও কারণ নেই।’
এখন ভাইপো বিকাশ দেবশর্মাকে নিয়ে থাকেন। বৌমা গীতা দেবশর্মা সুরেশকে বাবার চোখেই দেখেন। মাঝেসাঝে পালা করেন। বাকি সময় দোকান চালান। দীর্ঘদিন নারীচরিত্রে অভিনয়ের অভ্যাসেই হয়তো কথা বলার সময়, চলনবলনের সময় হাত দুটো নড়ে ওঠে বেশি। চোখের পাতা ঘনঘন পড়ে। সুরেশ বলেন, ‘মঞ্চ আমাকে ডাক দিয়েছিল, আমি এগিয়ে এসেছিলাম। মন্ত্র আমাকে নারীচরিত্র দিয়েছে। আমিও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি।’
মঞ্চের দিকে হেঁটে যান সুরেশ। আর কোথা থেকে জানি, চিত্রাঙ্গদা সিনেমার রুদ্র চ্যাটার্জি চরিত্রে অভিনয় করা ঋতুপর্ণ ঘোষের ছায়াটা তাঁর পাশে পাশে লম্বা হয়ে পড়ে!

