জনশ্রুতি আছে, বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গল থেকে বুনো হাতির দল এই জলাশয়ে জল খেতে ও স্নান করতে আসত। ‘হাতিদের ডোবা’ বা ‘গজ-ডোবা’ লোকমুখে উচ্চারিত হতে হতে কালক্রমে অপভ্রংশ হয়ে গজলডোবা-য় পরিণত হয়েছে। তবে, অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত হলেও ‘গজর’ মাছের তত্ত্বটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুপ সাহা, ওদলাবাড়ি: বর্তমানে উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র গজলডোবা (Gajoldoba Name Origin) ৫০ বছর আগেও ছিল নলখাগড়ার বন। তিস্তা ব্যারেজের নির্মাণকাজ শুরুর সময় ১৯৭৫-’৭৭ সালে এখানে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে ওঠে। তিস্তাপাড়ের ভাঙনকবলিত গ্রাম পশ্চিম প্রেমগঞ্জ থেকে বেশ কয়েকটি উদ্বাস্তু পরিবারকে তুলে এনে গজলডোবায় পুনর্বাসন দেওয়া হয়। ফলে এলাকার নাম গজলডোবা কেন হল তা নিয়ে এই প্রজন্মের স্থানীয় বাসিন্দাদের খুব বেশি ধারণা নেই। ১৮৭৫ সালে ডুয়ার্সের প্রথম চা বাগান হিসেবে গজলডোবা টি এস্টেটের নাম জড়িয়ে আছে। এখন অবশ্য সেই চা বাগানের অস্তিত্ব খোঁজা অনেকটা মরুভূমিতে সুচ খোঁজার মতো।


‘গজলডোবা’ নামকরণের নেপথ্যে মূলত দুটি লোককথা বা ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। সবচেয়ে প্রচলিত মতানুসারে, গজলডোবা নামটি এসেছে দুটি শব্দ থেকে। প্রথমটি হল ‘গজ’ (যার অর্থ হাতি) এবং দ্বিতীয়টি ‘ডোবা’ (অর্থাৎ ছোট জলাশয় বা পুকুর)।
একসময় এই অঞ্চলটি বৈকুণ্ঠপুর বনাঞ্চলের গভীর অরণ্যে ঢাকা ছিল। তিস্তার চর ও সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর নীচু জলাশয় বা ডোবা ছিল। জনশ্রুতি আছে, বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গল (Baikunthapur Forest) থেকে বুনো হাতির দল এই জলাশয়ে জল খেতে ও স্নান করতে আসত। এলাকাবাসীর কাছে এটি ‘হাতিদের ডোবা’ বা ‘গজ-ডোবা’ হিসেবে প্রচলিত ছিল। লোকমুখে উচ্চারিত হতে হতে কালক্রমে অপভ্রংশ হয়ে নামটি গজলডোবা-য় পরিণত হয়েছে।
অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত হলেও ‘গজর’ মাছের তত্ত্বটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ডঃ আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, “একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে উত্তরবঙ্গের এই প্রান্তের বহু গ্রামের নামকরণ বিভিন্ন মাছের নামে হয়েছে। মাগুরমারি, শিঙ্গিমারি, পুঁটিমারি ও চ্যাংমারি প্রভৃতি। সেদিক থেকে চিন্তা করলে স্থানীয় ভাষায় অপভ্রংশ হয়ে ‘গজর’ মাছের ‘গজল’ হওয়া এবং ডোবার আধিক্যের জন্য জায়গাটির গজলডোবা নামকরণ যুক্তিযুক্ত। পাশাপাশি প্রামাণ্য নথি হিসেবে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের পুরোনো সরকারি রেকর্ডেও ‘গজলডোবা’ নামকরণের বর্ণনায় ‘গজর’ মাছের নাম ‘গজল’ হওয়ার উল্লেখ আছে।” এছাড়া তিস্তার চরের এই নির্দিষ্ট এলাকার ডোবাগুলিতে একসময় গজল মাছের প্রাচুর্য ছিল। সেটিকেও অনেকে গজলডোবা নামকরণের কারণ বলে মনে করেন।
রাজ্যের একটি পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গজলডোবা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অনেক বেশি আগ্রহের হলেও ‘গজলডোবা’ নাম সম্পর্কে নবীন প্রজন্মের তেমন ধারণা নেই।

