Gen Z Dating Terms | ভাঙা নীড়ে আলগা প্রেমের বাঁধন, জেন জেড প্রজন্মের সম্পর্কের নতুন রসায়ন

শেষ আপডেট:

দীপ সাহা

আকাশের ক্যানভাসে তখন এক অদ্ভুত রঙের মোহ। অস্তমিত সূর্যের শেষ লালচে আভা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে তার জায়গা করে নিচ্ছে এক গভীর, শান্ত নীলচে আঁধার। শালবাড়ির রাস্তার ধারের ক্যাফেতে জেন জেডদের ভিড় জমছে একটু একটু করে (Gen Z Dating Terms)।

স্ত্রীকে স্কুটারে চাপিয়ে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে কোন আক্কেলে যে ওই ক্যাফেতে ঢুকে পড়েছিলেন সুমন্তবাবু, কার্যত মাথা চাপড়াচ্ছিলেন নিজেই। দুজনেই কফি কাপে প্রায় শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠব উঠব করছেন, হঠাৎই পাশ থেকে কানে ভেসে এল অদ্ভুত সব শব্দবন্ধ।

ঠিক পেছনেই বসে থাকা দুই কিশোরী তখন নিজেদের মধ্যে গল্পে মত্ত। একজন আরেকজনের উদ্দেশে বলছে, ‘জানিস, সায়নকে আজ ফাইনালি ঘোস্ট করলাম। বড্ড পজেসিভ হয়ে যাচ্ছিল। আদির সঙ্গে এখন সিচুয়েশনশিপে আছি। নো ড্রামা, জাস্ট চিল!’

কফিটা শেষ করে বিল মিটিয়ে তড়িঘড়ি স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন সুমন্তবাবু। হাসতে হাসতে নাকি স্ত্রীকে বলতে থাকেন, ‘ভুল জায়গায় ঢুকে পড়েছিলাম গো।’

তবে অবচেতন মনে ওই শব্দবন্ধগুলো কুরে-কুরে খাচ্ছিল অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্তা সুমন্ত ভট্টাচার্যকে। বাড়ি এসে সেদিনই ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘোস্ট, সিচুয়েশনশিপ শব্দের মানে বের করার চেষ্টা করেন। পরে বলছেন, ‘ঘোস্ট মানে আমরা জানতাম ভূত। ঘোস্ট করলাম মানেটা কী জানার জন্য মনটা আনচান করছিল। এ তো সত্যিই ভূতের মতো সম্পর্ক। কোন যুগে দাঁড়িয়ে আছি আমরা!’

কয়েক দশক আগের কথা, টেলিফোনের তারে তারে যখনও শব্দেরা বন্দি হয়নি, তখন প্রেম ছিল এক অনন্ত প্রতীক্ষা। বইয়ের গোপন ভাঁজে সযত্নে গুঁজে রাখা চিঠির প্রতিটি অক্ষরে মিশে থাকত এক বুক-কাঁপানো ব্যাকুলতা। অলস দুপুরে দূর থেকে ভেসে আসা সাইকেলের পরিচিত ‘ক্রিং ক্রিং’ শব্দটাই যেন হৃদয়ে তুলত এক অকারণ মন কেমন করা সুর। আজ যান্ত্রিকতার ভিড়ে সেই প্রতীক্ষার মাধুর্য হারিয়ে গিয়েছে চিরতরে। আর তাই ভালোবাসার ব্যাকরণ থেকে ‘প্রতিশ্রুতি’ বা ‘জনম জনমের তরে’ কথাগুলো যেন ডিলিট হয়ে গিয়েছে। তার জায়গা নিয়েছে একগুচ্ছ নতুন শব্দ।

পাহাড়ি নদীর মতো উদ্দাম আজকের স্কুল পড়ুয়াদের সম্পর্কের গতিপথ বোঝা বড় দায়। এদের প্রেমের অভিধানে ‘সিচুয়েশনশিপ’ হল সম্পর্কের এমন এক ধূসর গোধূলিবেলা, যেখানে দুজনে একসঙ্গে লং ড্রাইভে যাবে, কফি খাবে, কিন্তু কারও প্রতি কোনও দায়বদ্ধতা থাকবে না। আর আছে ‘বেঞ্চিং’। ঠিক যেন ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’ বলে কাউকে অপেক্ষায় রাখা, মূল খেলোয়াড় ফসকালে তবেই যার ডাক পড়বে। ছিটেফোঁটা আশা দিয়ে কাউকে টিকিয়ে রাখাকে এদের ভাষায় যাকে বলে ‘ব্রেডক্রাম্বিং’। আর একঘেয়ে লাগলে বিনা নোটিশে জীবন থেকে উধাও হয়ে যাওয়াটা তো এদের কাছে ‘ঘোস্টিং’।

প্রেম এখন আর ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ গাওয়ার মতো কোনও সাধনার বিষয় নয়, বরং অনেকটা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশনের মতো। বন্দে ভারতের স্পিডে চলা এই প্রজন্মে, ব্রেক-আপ কোনও যন্ত্রণার বিষয় নয়, বরং এক অদ্ভুত অহংকারের।

কিন্তু বয়ঃসন্ধির এই ছেলেমেয়েগুলোর মনে এমন ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ মানসিকতা এল কোথা থেকে? মনোবিদরা এর শিকড় খুঁজছেন আমাদেরই বসার ঘরে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মৌকণা মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘সমাজ বদলাচ্ছে, আর তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেই পুরোনো একান্নবর্তী পরিবারের রমরমা। আজ সেখানে জায়গা নিয়েছে ফ্ল্যাটবাড়ির নিঃসঙ্গতা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্ব, দাম্পত্যকলহ আর অবশেষে সেপারেশন বা ডিভোর্স, এই শব্দগুলো আজকের খুদেদের কাছে অতিপরিচিত। তারা খুব কাছ থেকে দেখছে, যে মানুষ দুটো একদিন তোমায় আমায় মিলন হবে বলে ভালোবাসার কসম খেয়েছিল, আজ তারা পারিবারিক আদালতের বারান্দায় একে অপরের দিকে কাদা ছুড়ছে। এই তিক্ততা, এই ভাঙন শিশুমনে এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিচ্ছে।’

পরিসংখ্যান বলছে, বিদেশের মতো ভারতেও এখন বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়ছে। আর তাই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লিভ-ইন রিলেশনশিপও। সোমবারই এধরনের একটি মামলায় উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ শুনিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি এনভি নাগরত্ন মনে করছেন, ‘একত্রবাসের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া মানেই তা অপরাধ নয়’। ফলে এই ধরনের সম্পর্কে যে দায়বদ্ধতা কম, তা মেনে নিচ্ছে আদালতই। আর ঠিক এই একই বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চাইছে জেন জেড।

মনোবিদ গার্গী দত্ত কুণ্ডুর কথায়, ‘পরিণত বয়সের আগেই ওরা অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, কোনও সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়। প্রতিশ্রুতি মানেই শেষে গিয়ে একরাশ বুকভাঙা যন্ত্রণা। তাই তারা এমন এক নিরাপদ দূরত্ব খুঁজছে, যেখানে আঘাত পাওয়ার ভয় নেই।’

‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে’- এই ভয়েই তারা গভীর জলে সাঁতার কাটার চেয়ে, পাড়ে বসে পা ভেজানোতেই বেশি স্বস্তি পায়। সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ‘সিচুয়েশনশিপ’ বা ‘হুক-আপ’ আসলে এক ধরনের আত্মরক্ষার বর্ম। কিন্তু আদতে এখানেই লুকিয়ে মন খারাপের বীজ।

অভিভাবকরা আসলে অনেক সময় দিশেহারা হয়ে পড়ছে। কর্মব্যস্ত জীবনে তাঁরা ভাবছেন, সন্তানের হাতে দামি গ্যাজেট তুলে দিলেই হয়তো দুনিয়া হাতের মুঠোয় চলে আসবে। কিন্তু সেই মুঠো গলেই যে সন্তানের শৈশব আর বিশ্বাসগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তা তাঁরা ঠাওর করতে পারেন না। গার্গী সেই রেশ টেনেই বলছেন, ‘যে কোনও সম্পর্ক একটা গাড়ির মতো। নির্দিষ্ট সময় পরপর মেইনটেনান্স করাতে হয়। তা না হলে জীবনের পথে বারবার ধাক্কা খেতে হয়।’

ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের শিক্ষক ধ্রুব চট্টোপাধ্যায়ও গার্গীর কথায় একমত। তিনি বলছেন, ‘আমরা অনেকদিন ধরেই খেয়াল করছি, ক্লাস সিক্স-সেভেনের বাচ্চারাও অদ্ভুত সব সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু ওদের শুধু দোষ দিলে হবে না। অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকরা দায়ী। সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কগুলো অনেকেই দাম দেন না। যার ফলে বাচ্চারা অন্য পথ খুঁজছে।’

ডুয়ার্সের জঙ্গলে যখন সন্ধে নামে, তখন পাতা ঝরার শব্দেও একটা অদ্ভুত মায়া থাকে। অথচ আজকের এই ডিজিটাল প্রেমে সেই ‘মায়াবনবিহারিণী’র মায়ার বড় অভাব। আগামী প্রজন্ম কি এই একাকিত্বের খাঁচাতেই বন্দি থাকবে, নাকি একদিন তারা নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে গাইবে, ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব’? তারা কি খুঁজবে সেই পুরোনো, বিশ্বস্ত নির্ভরতার আশ্রয়? উত্তরটা আপাতত ভবিষ্যতের গর্ভেই তোলা থাক।

Shahini Bhadra
Shahini Bhadrahttps://uttarbangasambad.com/
Shahini Bhadra is working as Trainee Sub Editor. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Online. Shahini is involved in Copy Editing, Uploading in website.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

Swapna Barman | ‘বাড়ি জ্বালিয়ে দিল’! স্বপ্না বর্মনের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শোরগোল

উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি...

Witchcraft Allegation | রায়গঞ্জে ডাইনি অপবাদের নারকীয় অন্ধকার, দম্পতিকে মলমূত্র খাওয়ানোর অভিযোগ!

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: একবিংশ শতাব্দীতেও কুসংস্কারের চরম অন্ধকার রায়গঞ্জে।...

Cooch Behar | শুভেন্দুর কনভয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় ‘অ্যাকশন’! কোচবিহারে গ্রেপ্তার ব্লক সভাপতি সহ ৩ তৃণমূল নেতা

শিবশংকর সূত্রধর,কোচবিহার: গত বছর খাগড়াবাড়িতে শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari)...

Cooch Behar | এমজেএন মেডিকেলে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে কাঠগড়ায় হাসপাতাল! গঠন হল তদন্ত কমিটি

কোচবিহার: এমজেএন (MJN) মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (Cooch Behar)...