Goutam Deb | ব্যস্ত রাজনীতির আড়ালে একলা ঘর: শিলিগুড়ির লড়াইয়ে কতটা আত্মবিশ্বাসী গৌতম?

শেষ আপডেট:

প্রিয়দর্শিনী বিশ্বাস, শিলিগুড়ি: দাবি করেন, রাজনীতির ময়দানে হাফ সেঞ্চুরি পার করেছেন ইতিমধ্যে। দীর্ঘদিনের কাউন্সিলার, বিধায়ক ছিলেন। মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন। মেয়র হিসেবে কার্যকাল চার বছর। গান গাইতে বড্ড বেশি ভালোবাসেন। যে কোনও অনুষ্ঠানে, টিকিটপ্রাপ্তির পর, রামনবমীর সকালে- সুর ধরেন। অনেকেই ঠাট্টা করেন তাঁর গান গাওয়া নিয়ে। তাতে অবশ্য পাত্তা দিতে নারাজ মুখ্যমন্ত্রীর ‘চিরদিনের চিরসাথি’।

চারপাশে গুণগাইয়েদের বলয় আছে, সমালোচকদের কটাক্ষ আছে, বিরোধীদের বাউন্সার আছে, শহরজুড়ে চলা বেআইনি কর্মকাণ্ডে মদত দেওয়ার অভিযোগ আছে, দলের একাংশ নেতা-জনপ্রতিনিধি ভুল পথে হাঁটলেও চোখ বন্ধ করে রাখার মতো ইস্যু আছে- তবুও তিনি বিন্দাস আছেন। তিনি গৌতম দেব (Goutam Deb)।

এবছরের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী শিলিগুড়ি বিধানসভা আসনে। তাঁর সঙ্গে সম্মুখসমরে বিদায়ি বিধায়ক শংকর ঘোষ, দীর্ঘদিনের কাউন্সিলার শরদিন্দু চক্রবর্তী এবং আইনজীবী মহলে পরিচিত মুখ অলোক ধাড়া। লড়াই কঠিন, তবুও একচুল জমি ছাড়তে নারাজ কলেজপাড়ার মানুষটি।

গৌতম রাজনীতির আঙিনায় যথেষ্ট প্রভাবশালী। দিনভর ব্যস্ততায় ডুবে থাকলেও বাড়ি ফিরে পরিবারকে ভীষণ মিস করেন। শিলিগুড়ির (Siliguri) বাড়িতে তাঁর এক্কেবারে নিজের বলতে কেউই নেই এখন। পরিবারের অন্য সদস্যরা নানা কারণে বাইরে থাকেন। অবসর সময় কাটে গান শুনে, পোষ্যদের আদর করে, বই পড়ে।

মেয়ে বড় আদরের। তাঁকে নিয়ে গৌতমের গর্বের শেষ নেই। মাঝেমধ্যে মন খারাপ হলেও নিজেকে সান্ত্বনা দেন এই বলে, ‘ওরা থাকলে অভিমান করত। কারণ, এই মুহূর্তে সত্যিই আমার দম ফেলার ফুরসত নেই। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভোটের প্রচার চালাতে হচ্ছে সকালবিকাল। সাংগঠনিক সভায় যাচ্ছি। পরিবারের জন্য আলাদা করে সময় বের করা মুশকিল হত।’

শৈশব থেকে একান্নবর্তী পরিবারে আদরে মানুষ হওয়া গৌতম ঘরোয়া কাজে কখনোই পটু ছিলেন না। এখনও তাই গৃহসহায়কদের ওপর নির্ভরশীল। খাওয়াদাওয়া থেকে ঘর গোছানো সবটাই তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। মাঝেমধ্যে খানিকটা তদারকি করেন তিনি।

ভোটের প্রচারের জেরে রোজকার রুটিনে বদল এসেছে। আগে সকাল সাড়ে ছয়টা-পৌনে সাতটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে প্রাতর্ভ্রমণ, তারপর শরীরচর্চা করতেন। তারপর ঘণ্টাখানেক ধরে একাধিক সংবাদপত্র পড়ার অভ্যেস ছিল। এখন সকালসকাল বেরিয়ে যেতে হয়। ব্রেকফাস্ট বলতে আখরোট, ভেজানো মুগ, ডিমের সাদা অংশ, সেদ্ধ সবজি, ফল। তাড়াহুড়ো থাকলে অবশ্য শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে যান প্রচারে। কখনও আবার সেই সময়টুকুও পান না। প্রচারের মাঝেই সারেন প্রাতরাশ।

দুপুরের খাবার সাধারণত পুরনিগমে খেতেন আগে। এখন বেশিরভাগ দিন বাড়িতেই ফেরেন। পছন্দের খাবারের তালিকায় মাছ-ভাত কিংবা চাইনিজ থাকলেও, শরীর ঠিক রাখতে হালকা খাবারেই ভরসা রাখছেন। দিন শেষে বাড়িতে ঢোকেন ক্লান্ত শরীর নিয়ে। ভারী খাবার এড়িয়ে চলেন। কোনও কোনও দিন জল-বিস্কুট বা মুড়ি খেয়েই রাত কাটিয়ে দেন।

তাঁর পরিবারের কেউ রাজনীতির আঙিনায় পা রাখেননি। বাড়ির বড়দের ইচ্ছে ছিল, গৌতম ডাক্তার বা আইনজীবী হবেন। পরিবারের প্রায় সকলেই ছিলেন আইনি পেশার সঙ্গে যুক্ত। গৌতম সে পথে হাঁটেননি। কলেজ জীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি। সেই পথকেই আঁকড়ে ধরেন।

একাধিক পোষ্য সারমেয় রয়েছে বাড়িতে। একসময় প্রচুর পাখিও ছিল। সময় পেলে নাকি একা একাই সিনেমা দেখেন। কখনওবা পরিচিতদের ডেকে আড্ডা জমান। বলছিলেন, ‘একা থাকলে মনের, মাথার অনেক জট কাটে। স্মৃতিচারণ করা যায়।’ ক্লান্তি কাটাতে অল্প সময় ঘুমিয়েও নেন।

রাজনীতিবিদ, প্রশাসকের ভূমিকায় কঠোর হতে হয়। বিরোধীদের তোপ দাগতে হয়। দলের নেতা-কর্মী, সরকারি আধিকারিকদের বকাঝকাও করেন। কিন্তু পরিবার পাশে না থাকার এক প্রচ্ছন্ন অভাব বোধ গৌতমের মনেও যে ক্ষত তৈরি করেছে, সেটা তাঁর কথায় স্পষ্ট। বিশেষ করে মেয়ের প্রতি টান অপরিসীম। বলছিলেন, ‘আমার মেয়ে শ্রেয়ার কথা খুব মনে পড়ে। ফোনে ওর সঙ্গে কথা হয়। স্ত্রী আর ছেলের সঙ্গে মাঝেমধ্যে ফোনে যোগাযোগ করি।’

এরপর খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলেন, ‘পরিবার সঙ্গে থাকলে ভালো হত ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির চাপে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অপরাধবোধও সইতে হত। তিন-চারজন বিশ্বস্ত গৃহসহায়কের ওপরই সংসার ছেড়ে দিয়েছি। থামতে তো হবেই একদিন, তখন আবার এই ব্যস্ততা ভীষণরকম মিস করব।’

এই বলে মুচকি হেসে কোলে থাকা পোষ্যটির গালে চুমু খেলেন আলতো করে, লেজ নাড়িয়ে উঠল সে।

Sushmita Ghosh
Sushmita Ghoshhttps://uttarbangasambad.com/
Sushmita Ghosh is working as Sub Editor Since 2018. Presently she is attached with Uttarbanga Sambad Digital. She is involved in Copy Editing, Uploading in website and various social media platforms.

Share post:

Popular

More like this
Related

WB Election 2026 | নগেনের ভূমিকা নিয়ে দ্বন্দ্বে গেরুয়া শিবির! মঞ্চে সক্রিয়, ময়দানে নিস্তব্ধ

তুফানগঞ্জ: কোচবিহারের রাজনীতিতে নগেন রােয়র অবস্থা যেন ঠিক ‘ধরি...

WB Election 2026 | ঘোড়ার গাড়ি, নৌকায় পৌঁছে ভোট সংগ্রহে কর্মীরা

তুফানগঞ্জ ও দিনহাটা: বুধবার কোথাও ঘোড়ার গাড়ি চেপে, তো...

Nishiganj | ভোটারের মন ছুঁতে দুয়ারেই ভরসা প্রার্থীদের

নিশিগঞ্জ: দুয়ারে ভোটের আবহে দলীয় পতাকায় মোড়া ঝাঁ চকচকে...

CBSE Success of Moupia | সিবিএসই দশমে বাজিমাত মৌপিয়ার, ৯৯.৪ শতাংশ নম্বর পেয়ে নজির ফাঁসিদেওয়ার ছাত্রীর

ফাঁসিদেওয়া: ২০২৬ সালের সিবিএসই (CBSE) দশম শ্রেণির ফলাফল প্রকাশিত...