উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: ক্যানসারের (Cancer) এমন কিছু উপসর্গ রয়েছে, যা নিয়ে কথা বলতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও লজ্জায় ভোগেন অনেক মহিলা, এমনকি বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করেন। অথচ ঠিক সময়ে শনাক্ত হলে সুস্থ হওয়া সম্ভব। যেমন মহিলাদের জরায়ুমুখের ক্যানসার এমন একটি রোগ যা সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। লিখেছেন শিলিগুড়ির হোপ অ্যান্ড হিল ক্যানসার হসপিটাল ও রিসার্চ সেন্টারের কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডাঃ বিশাল মুখোপাধ্যায়
গাইনিকলজিক্যাল ম্যালিগন্যান্সি
এদেশে সবথেকে পরিচিত গাইনিকলজিক্যাল ম্যালিগন্যান্সির মধ্যে রয়েছে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। স্তন ক্যানসারের পরে এটি মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয় অতি সাধারণ ম্যালিগন্যান্সি। এর পরে কার্সিনোমা ওভারি এবং তারপর কার্সিনোমা এন্ডোমেট্রিয়াম হয়ে থাকে।
ঝুঁকির কারণ
জরায়ু গ্রীবার ক্যানসার – হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন, একাধিক যৌন সঙ্গী, উচ্চ ঝঁুকিপূর্ণ যৌন আচরণ, এইচআইভি-এইডস, ধূমপান।
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার – পারিবারিক ইতিহাস, জেনেটিক মিউটেশন, হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি
জরায়ুর অভ্যন্তরীণ স্তর ক্যানসার – ওবেসিটি, পারিবারিক ইতিহাস, ইস্ট্রোজেন থেরাপি, ট্যামোক্সিফেন (স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ড্রাগ)
উপসর্গ
জরায়ু গ্রীবার ক্যানসার – সহবাসের পর রক্তপাত, সাদা স্রাব
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার – পেটের প্রসারণ, পেলভিক পেন, পেলভিক মাস
জরায়ুর অভ্যন্তরীণ স্তর ক্যানসার – যোনি দিয়ে অস্বাভাবিক রক্তপাত, মেনোপজ-পরবর্তী রক্তপাত, পেলভিক পেন
সাবধানতা
জরায়ু গ্রীবার ক্যানসার – সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ক্যানসারের ভ্যাকসিন নেওয়া
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার – হরমোনের অনির্দিষ্ট চিকিৎসা এড়িয়ে চলা, পারিবারিক ইতিহাস থাকলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করানো উচিত, সঙ্গে দ্রুত শনাক্তকরণের জন্য রক্তপরীক্ষা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো উচিত।
জরায়ুর অভ্যন্তরীণ স্তর ক্যানসার – হরমোনের অনির্দিষ্ট চিকিৎসা এড়িয়ে চলা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, ওজন যাতে না বাড়ে সেদিকে নজর রাখা
কার্সিনোমা সার্ভিক্স ভ্যাকসিনেশন
কার্সিনোমা সার্ভিক্সের ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন উপস্থিত থাকে। রোগীর বয়সের ওপর নির্ভর করে দুই বা তিন ডোজ এইচপিভি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ে থাকে। ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সিদের প্রথম মাসে এবং ষষ্ঠ মাসে একটা করে মোট দুটো ডোজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সিদের প্রথম মাসে, দ্বিতীয় মাসে এবং ষষ্ঠ মাসে একটি করে মোট তিনটে ডোজ দেওয়া হয়ে থাকে।
পাশ্চাত্যে এই ভ্যাকসিনেশন খুবই জনপ্রিয়। ভারতীয় বাজারেও এই ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এখনও তেমন জনপ্রিয় নয়।
ক্যানসারেই ভুগছেন, অন্য কোনও রোগে নয় – বুঝবেন কীভাবে
ক্যানসার শনাক্তকরণে বায়োপ্সি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি সার্জনের সন্দেহ হয় কার্সিনোমা সার্ভিক্স বা কার্সিনোমা এন্ডোমেট্রিয়াম হয়েছে আপনার, তাহলে অবশ্যই বায়োপসি করানো উচিত। এটি একদিনেই করা যায় এবং রোগীকে েসইদিনেই ছেেড় দেওয়া যেতে পারে।
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং বায়োপসি
সিটি স্ক্যানের সময়ে যদি দেখা যায়, টিউমারটি ডিম্বাশয়ের কাছে রয়েেছ তাহলে দেরি না করে সার্জারি করিয়ে নেওয়া উচিত। অত্যাধুনিক কার্সিনোমা ওভারির কিছু ক্ষেত্রে বায়োপসি করার প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে রোগের ঘনত্ব (পরিমাণ) কমাতে প্রথমে কয়েকবার কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। তারপর অস্ত্রোপচার করা হয়।
সম্পূর্ণ জরায়ু ও উভয় ডিম্বাশয় বাদ দেওয়া কি যথেষ্ট
ক্যানসারে অস্ত্রোপচার ও অস্ত্রোপচারের ব্যাপ্তি – দুটোই খুব আলাদা। শুধু জরায়ু বা উভয় ডিম্বাশয় বাদ দেওয়া যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে যা করণীয়:
জরায়ু গ্রীবার ক্যানসার – প্রাথমিক পর্যায়ে যদি টিউমার শনাক্ত করা যায় তাহলে জরায়ুর অপসারণ করার প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ হিস্টেরেক্টোমি থেকে সামান্য আলাদা।
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার – এই রোগে সাইটোরিডাক্টিভ সার্জারি করার প্রয়োজন হয়।
জরায়ুর অভ্যন্তরীণ স্তর ক্যানসার – হিস্টেরেক্টোমির সঙ্গে ড্রেনিং রেট্রোপেরিটোনিল নোডস এবং ওমেনটাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয়। তবে সাধারণ হিস্টেরেক্টোমি প্রায়ই রোগের পর্যায়ে চলে যায়।
সাইটোরিডাক্টিভ সার্জারি কী
স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত অন্য ম্যালিগন্যান্সির মতো কার্সিনোমা ওভারি দ্রুত পেটের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, যেমন- পেরিটোনিয়াম, নোডস প্রভৃতি।
সাইটোরিডাক্টিভ সার্জারির উদ্দেশ্য, পেটের সব অংশ থেকে রোগটিকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দেওয়া। এই ধরনের অস্ত্রোপচারে ৬-৮ ঘণ্টা সময় লাগে। ডিম্বাশয়ে ক্যানসারের ক্ষেত্রে পেটের থেকে সব সমস্যা দূর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির ভূমিকা
জরায়ু গ্রীবার ক্যানসার – ক্যানসার সার্ভিক্সের চিকিৎসায় কেমোরেডিথেরাপি প্রধান ভরসা। একেবারে শুরুতে শুধুমাত্র অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে অ্যাডভান্সন্ড স্টেজে অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন হয় না। কেমোরেডিথেরাপিতেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন।
ডিম্বাশয়ের ক্যানসার – ডিম্বাশয়ে ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের সঙ্গে কেমোথেরাপিও জরুরি। দেখা গিয়েছে, এতে যেমন আয়ু বাড়ে, তেমনই ক্যানসার পুরনরায় ফিরে আসাও প্রতিরোধ করা যেতে পারে। আরও উপকার পেতে এখন কেমোথেরাপির সঙ্গে ইমিউনোথেরাপিও যুক্ত করা হয়েছে।
জরায়ুর অভ্যন্তরীণ স্তর ক্যানসার – এক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের সঙ্গে রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি – উভয়ই প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে ফাইনাল বায়োপসি রিপোর্টের উপরে। কারণ, এই রিপোর্টে উচ্চ ঝঁুকিরও উল্লেখ থাকে। ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রির ওপর ভিত্তি করে মলিকিউলারের শ্রেণিবিন্যাস চিকিৎসায় নতুন পরিবর্তন এনেছে। মলিকিউলারের এই শ্রেণিবিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে আমরা কম ঝঁুকিসম্পন্ন রোগী এবং বেশি ঝঁুকিসম্পন্ন রোগীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারি, যা চিকিত্সায় সহায়ক হয়।

